একসময় ‘অবরোধ’ ছিল ঐতিহাসিক বিষয়। সেকালে রাজা, রাজ্য, রাজধানী জয়ের প্রক্রিয়ায় অবরোধ ছিল একটি বাস্তব রণকৌশল। দুর্গ বা রাজধানী অবরোধ করে অবশেষে বিজয় লাভের আশায় দিন গুনতেন রাজা বাদশাহরা। সেসব বিষয় ছিল একান্তই বিরল। ‘অবরোধ’ সেই ঐতিহ্য হারিয়েছে অনেক আগে। আধুনিক বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রে অবরোধ একটি অস্বাভাবিক শব্দ। কিন্তু বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে অবরোধ নিত্যদিনের সঙ্গী। ঔপনিবেশিক যুগে মুক্তি সংগ্রামের কোনো কোনো পর্যায়ে অবরোধ সঙ্গতভাবেই ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু নাগরিক অধিকার তথা গণতন্ত্রের সংগ্রামে অবরোধ কৌশল হিসেবে এখনো মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে কার্যকর রয়ে গেছে।
সন্দেহ নেই অবরোধ হচ্ছে প্রতিবাদের ভাষা। মুক্তি সংগ্রামের বাহন। রাজনৈতিকভাবে অবরোধের বৈধতা হয়তো আছে। বাংলাদেশের রাজনীতির অর্ধশতাব্দীতে অসংখ্যবার অবরোধের ব্যবহার হয়েছে। অবরোধের গতি প্রকৃতি ও পরিণতি হিসাব করে আন্দোলনের শেষ অস্ত্র হিসাবে এটি আরোপ করা হয়। কিন্তু শেষ অস্ত্রটি যখন সূচনাতেই ব্যবহার করা হয় তখন কষ্টের অন্ত থাকে না। রাজনীতিতে একেক সময় একেকটা কৌশল বা অপকৌশল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আন্দোলন সংগ্রামে এটা খুব জনপ্রিয় স্লোগান ‘আগুন জালাও একসাথে’। গত কয়েক বছর ধরে আগুনের প্রকোপ কিছুটা কমে এলেও সাম্প্রতিক সময়ে আগুন আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষত ২০২৪ সালের গণবিপ্লবে স্বৈরাচারের প্রতীকী সব কিছুতে মানুষ আগুন দিয়েছিল। উন্নয়নের নামে গণতন্ত্রের সংগ্রাম প্রতিহত করার জন্য যে প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে সেখানেও ক্ষোভ আছড়ে পড়েছে মানুষের। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে অবরোধ আরোপ করা হয়। ক্রমাগত সফলতার পর এই অবরোধ ছিল শাসকদের কাছে শেষ বার্তা। অবরোধ এখন শেষ বার্তা না হয়ে অস্থিরতার ও অরাজকতার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। যখন তখন যেখানে সেখানে অবরোধের মতো শেষ অস্ত্র ভাত মাছের মতো স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। আন্দোলনকারী বা প্রতিবাদকারীদের ভাষায় যা হচ্ছে দাবি আদায়ের মোক্ষম অস্ত্র তা জনগণের জন্য অস্বাভাবিক ও অসাধারণ দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অবরোধ যে নতুন করে দেখা দিয়েছে, বিষয়টি এরকম নয়। বিগত সব শাসন আমলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে অবরোধ চর্চা হয়েছে। অতি তুচ্ছ বিষয় থেকে শুরু করে গুরুতর সব কিছুতেই অবরোধ প্রয়োগ করা হয়েছে। বিগত স্বৈরাচারের ১৫ বছরেও মানুষের সতত সাধারণ ক্ষোভের কারণ হিসাবে অবরোধের প্রয়োগ ঘটেছে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর অবাধ স্বাধীনতার কারণে অবাধ অবরোধের ঘটনাও ঘটছে। অবরোধ আইনগতভাবে অবৈধ কিন্তু অকারণ নয়। বাংলাদেশের বিগত ৫০ বছরেও আইন-কানুন, নিয়ম-রীতি ও প্রশাসনিক বিষয়াদি প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করেনি। বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদেরকে পেয়ে বসেছে। উদাহরণ হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনার মতো বিষয় সামনে আনা যায়। দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে বাস জ্বালিয়ে দেয়া বা ড্রাইভারকে বেদম প্রহার অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অস্বাভাবিক হলো সড়ক অবরোধ। সড়ক অবরোধ করতে গিয়ে মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর মৃত্যু ঘটে। জরুরি কাজগুলো স্থগিত হয়ে যায়। যাত্রীদের অসহনীয় অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। অথচ ওই মৃত্যু বা দুর্ঘটনার জন্য যাত্রীসাধারণ মোটেই দায়ী নন। এ জন্য তারা শাস্তি পেতে পারেন না।
বাংলাদেশের মানুষের আইন ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ওপর আস্থা নেই যে অন্যায়কারী বা দুর্ঘটনার জন্য দায়ীরা নিশ্চিতভাবেই বিচারের সম্মুখীন হবে। মানুষ যখন বোঝে যে, ঘুষের বিনিময়ে, দলতন্ত্রের দৌলতে কিংবা ক্ষমতার জোরে অপরাধী শাস্তি পাবে না, তখনই মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চায়। অতি সাম্প্রতিককালে প্রবলভাবে মব জাস্টিস বা গণবিচারের যে প্রবণতা দেখা দিয়েছে তা আইন ও শাসনের প্রতি অনাস্থার শামিল। বিস্ময়ের ব্যাপার যে অবরোধের মতো অবৈধ অস্ত্র প্রয়োগ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি-দাওয়া আদায়ে সমর্থ হচ্ছে। গত সোমবার বনানীতে যে গার্মেন্টস শ্রমিকটি মিনি ট্রাকের চাপায় নিহত হলো তারা যদি সড়ক অবরোধ না করত তাহলে কি অপরাধী চালক অত তাড়াতাড়ি গ্রেফতার হতো! প্রতিদিন এরকম অনেক মানুষ সড়কে প্রাণ দেয়, যাদের জন্য অবরোধ করার কেউ থাকে না। নায়করাজ ইলিয়াস কাঞ্চন এ ধরনের মৃত্যুর অবসানের জন্য নিরাপদ সড়ক আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তিনি চালকের মৃত্যুদণ্ড চেয়েছিলেন। সেই অপরাধে চালক সমিতি শাজাহান খানের মতো গডফাদারের সামনেই শহীদ মিনারে ওই নায়কের প্রতিকৃতিতে জুতার মালা ঝুলিয়ে দেয়। অনেকবার চালকদের অন্যায়ভাবে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য রাস্তা অবরোধ করা হয়েছে। ফলে চালক হত্যার আসামি হয়েও মুক্তি পেয়েছে। এভাবেই বৈধ অবরোধকে অবৈধ করা হয়েছে।
এখন আমাদের জন্য অবরোধ একটি দ্বৈধতা। অবরোধে আশু প্রতিকার পাওয়া যায়। আবার জনদুর্ভোগও দেখা দেয়। স্বাভাবিক নিয়মে যদি অপরাধী শাস্তি পায়, তাহলে অস্বাভাবিক উপায়ে অবলম্বিত হয় না। বস্তুত অবরোধের এত অপব্যবহার হয়েছে যে এটি প্রায়োগিক নৈতিকতা হারিয়েছে। গত কিছু দিনে অবরোধের নমুনা যদি উপস্থাপন করা যায় তাহলে দেখা যায় যে অবরোধ অসম্ভবভাবে ঘনঘন ও বারবার সংগঠিত হচ্ছে। গত এক মাসে অবরোধের ঘটনা নিম্নরূপ :
১. টঙ্গীতে বকেয়া বেতনের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, (১১ মার্চ ২০২৫)
২. জাবিতে ধর্ষকের বিচারের দাবিতে মশাল মিছিল, মহাসড়ক অবরোধ (১০ মার্চ ২০২৫)
৩. ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ইবি শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক অবরোধ (৯ মার্চ ২০২৫)
৪. স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ (২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)
৫. ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তিসহ ছয় দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের শাহবাগ মোড় অবরোধ (১১ মার্চ ২০২৫)
৬. সর্বস্তরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে ইবি শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক অবরোধ (৯ মার্চ ২০২৫)
৭. তিন দাবিতে রেলপথ অবরোধ রাবি শিক্ষার্থীদের (৫ মার্চ ২০২৫)
অবরোধের সংখ্যা এতই বেড়েছে যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো: সাজ্জাত আলী সম্প্রতি একটি সভায় মন্তব্য করেছেন যে, সড়ক অবরোধ করে দাবি আদায়ের প্রক্রিয়া বন্ধ করা উচিত। তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকায় যানজট একটি গুরুতর সমস্যা এবং একটি রাস্তা বন্ধ হলে তা অন্যান্য রাস্তার ওপরও প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। কমিশনার উল্লেখ করেন, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠন রাস্তা বন্ধ করে সরকারের কাছে তাদের দাবি জানাচ্ছে, যা শহরের যানজট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
অবরোধের এই অভিশাপ নাগরিক সমাজে অসম্ভব অসন্তোষের ও দুর্ভোগের কারণ। দেখা যাচ্ছে, ছাত্ররা সামান্য কারণে রাস্তা অবরোধ করছে। গত বছরগুলোতে নিউ মার্কেট এলাকায় ছাত্রদের এ ধরনের অবরোধে অনেক দিন ধরে অচল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অবরোধের কারণ খুঁজলে দেখা যায়, অমুক ছাত্রের সাথে অমুক দোকানের কর্মচারী খারাপ ব্যবহার করেছে। অথবা ঢাকা কলেজের ছাত্রের সাথে আইডিয়াল কলেজের ছাত্র বেয়াদবি করেছে। অমুকের প্রেমিকের সাথে অমুক দলের অমুক ভাই ভালো ব্যবহার করেনি। শিগগিরই বিষয়টি দলীয় পর্যায়ে চলে গেছে অথবা কলেজ বনাম কলেজ সংঘর্ষে রূপান্তরিত হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় একই ঘটনা ঘটছে। এদের বাধা দিলে তারা লড়াই করছে। পুলিশের ওপর চড়াও হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক পর্যন্ত আক্রান্ত হচ্ছে। অবরোধের মাত্রা থেকে কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না। অপরাধে দোকান কর্মচারী গ্রেফতার হয়েছে অতএব অবরোধ। অমুক নেতাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে সুতরাং অবরোধ। থানা ঘেরাও। সমস্যার সমাধানের দাবিতে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন নিবেদন না করে এলাকাবাসী করছে রাস্তা অবরোধ। ব্যবসায়ীরা ব্যবসায় শৃঙ্খলা বিধানের দাবিতে নিজেদের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না এনে বরং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। ছাত্ররা কোথাও না কোথাও প্রতিদিন অবরোধ করছে। অধ্যক্ষের অপসারণ চাইÑ সুতরাং অবরোধ। পরীক্ষা পেছানো চাই সুতরাং অবরোধ। বেতন কমাতে হবে সুতরাং অবরোধ। কিছু দিন আগে সাত কলেজের আন্দোলন নিয়ে ছাত্রদের তাণ্ডব নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে। এরপর তিতুমীর কলেজের ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালের দাবিতে মহাযানজট নিশ্চয়ই আপনাদের চোখ এড়িয়ে যায়নি। এভাবে অবরোধ জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করছে। এই অবৈধ অবরোধকে বৈধতা দেয়া যাবে না। এ জন্য যা করতে হবে তা হলো-
ক. ছাত্র এবং পেশাজীবীদের বুঝতে হবে যে একটি সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে জনদুর্ভোগ ডেকে আনা যাবে না। আইন ও শৃঙ্খলা বিধায়ক কর্তৃপক্ষকে প্রতিক্রিয়ার আগেই ক্রিয়াশীল হতে হবে। জনগণকে তাদের এই বিশ্বাস দিতে হবে যে, অবরোধ না করেই আইনের প্রয়োগ সম্ভব।
খ. আইন করে অবরোধকে বেআইনি ঘোষণা করতে হবে। অবরোধ যখন সীমালঙ্ঘন করেছে তখন এর জন্য একটি সীমারেখা নির্ধারণ অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
গ. রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে অবরোধ আরোপকে এড়িয়ে যেতে হবে। তাদের ক্রমে আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক পথে এগোতে হবে।
ঘ. অবরোধ তো মানুষ করে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এবং প্রতিকারের প্রত্যাশায়। লন্ডনের নাগরিকরা ট্রাফালগার নামক স্থানে সমবেত হয়ে যেকোনো বিষয় সমাজ ও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। স্বাধীনতার প্রথম দিকে এই আদলে জিরো পয়েন্টের বিপরীতে ছোট্ট জায়গাটিকে এমনভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছিল। এখন প্রেস ক্লাবের সামনের জায়গাটি এমন স্থানে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রতিদিন এখানে শত শত সংগঠন হাজার হাজার দাবি জ্ঞাপন করছে। অবরোধের পরিবর্তে এমন একটি জায়গা চিহ্নত হোক যেখানে সমবেত হলে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হবে। প্রয়োজনে সেখানে সরকারের একটি ইন্টেলিজেন্স টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করতে পারে।
ঙ. পুলিশ তথা সরকার এখন ৯৯৯ এর মাধ্যমে নাগরিক সেবা দিয়ে যাচ্ছে। সরকার ইচ্ছা করলে অবরোধ আরোপের বিকল্প হিসাবে একটি প্রতিকার টিম বা সেল গঠন করে জরুরি নম্বর জনগণকে জানিয়ে দিতে পারে।
চ. অবরোধের অভিশাপ সম্পর্কে সংবাদপত্রে, টিভি চ্যানেল ও অন্যান্য গণমাধ্যমে জানাতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে অবরোধ জনদুর্ভোগের কারণ। প্রতিকার নয়।
এত কথার সারমর্ম হলো অবরোধের অবসান। ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে’। যেকোনোভাবেই হোক, অবরোধ থেকে দেশের কোটি কোটি মানুষকে বিশেষত ঢাকা শহরকে যেকোনো মূল্যেই হোক রক্ষা করতে হবে। সব কথার শেষ কথা সুশাসন কায়েম হলে, সৎ ও যোগ্য মানুষের শাসন কায়েম হলে দেশের সর্বত্রই সব অন্যায়ের একসাথে অবসান না ঘটলেও ক্রমহ্রাস ঘটবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষ আমাদের এই আবেদনে সাড়া দেয়ার আহ্বান জানিয়ে শেষ করছি।
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়