ড. শাহজাহান খান
গত কয়েক দশকে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের বহু দিক নতুনভাবে ব্যাখ্যা ও পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে একটি বিষয় সবচেয়ে অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছে। সেটি হলো, পাকিস্তান আন্দোলনে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের তথা আজকের বাংলাদেশের মুসলমানদের অগ্রণী ভূমিকা। এমনও বলা হয়েছে, পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা পূর্ববঙ্গের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের ওপর পূর্বপাকিস্তান চাপিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান আন্দোলন কেবল উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম নেতাদের নেতৃত্বে হয়নি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা গঠন, আন্দোলন গড়ে তোলা এবং তার সফল বাস্তবায়নে বাঙালি মুসলমানরা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। তাদের নেতৃত্ব, নির্বাচনে গণরায় এবং প্রশাসনিক অবদান নতুন রাষ্ট্রের জন্মে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস অবিকৃত রাখতে হলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় পূর্ববাংলার মুসলমানদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতিদান অপরিহার্য।

ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক শক্তিকেন্দ্র
ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলা ছিল ভারতের সর্ববৃহৎ মুসলিম-অধ্যুষিত প্রদেশ। ১৯৪১ সালে এ প্রদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪ শতাংশ ছিল মুসলমান। জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব উভয় দিক থেকেই বাংলা ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। বাঙালি মুসলমানের সমর্থন ছাড়া মুসলিম ভারতের জন্য কোনো সাংবিধানিক ব্যবস্থা সফল হতে পারত না। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলার মুসলমানদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে ঢাকা।

মুসলিম লীগের জন্ম ঢাকায়
পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ ১৯০৬ সালে নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে মুসলমানদের অপর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব এবং বাংলায় বহু মুসলিম কৃষকের ওপর হিন্দু জমিদারদের আধিপত্যের প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে দলটির প্রতিষ্ঠা হয়। এর মাধ্যমে ভারতীয় মুসলমানদের সুসংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা ঘটে, যা পরবর্তীকালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।

লাহোর প্রস্তাব : এক বাঙালি নেতার ঐতিহাসিক ভূমিকা
পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ২৩ মার্চ ১৯৪০ সালে লাহোরে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে। বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবে ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়। পরে এটিই পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।

১৯৪৬ সালের নির্বাচন : বাঙালি মুসলমানদের গণরায়
পাকিস্তানের পক্ষে বাঙালি মুসলমানদের সমর্থনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন, যা কার্যত পাকিস্তান দাবির ওপর গণভোট হিসেবে বিবেচিত হয়। মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত আসনগুলোর মধ্যে মুসলিম লীগ বাংলা প্রদেশে ১১৯টির মধ্যে ১১৩টি (৯৫ শতাংশ), আসামে ৩৪টির মধ্যে ৩১টি (৯১ শতাংশ), পাঞ্জাবে ৮৬টির মধ্যে ৭৩টি (৮৫ শতাংশ) এবং সিন্ধে ৩৫টির মধ্যে ২৭টি (৭৭ শতাংশ) আসনে বিজয়ী হয়।

পুরো ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত অধিকাংশ আসনেই মুসলিম লীগ বিজয়ী হয়। তবে বাংলার ফলাফল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করে, পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে নয়; বাংলার সাধারণ মুসলিম ভোটারদের মধ্যেও ব্যাপকভাবে ছিল।

হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রচেষ্টা
স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের দাবি তোলার আগে বহু বিশিষ্ট মুসলিম নেতা ঐক্যবদ্ধ ভারতের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার আন্তরিক চেষ্টা চালান। রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাংবিধানিক সহযোগিতার পক্ষে ছিলেন। একইভাবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এককালীন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এ কে ফজলুল হক এবং মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও হিন্দু-মুসলমান শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চেষ্টা করেন। কিন্তু তিক্ত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে শেষ পর্যন্ত তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ঐক্যবদ্ধ ভারতে মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্বার্থ আদৌ সুরক্ষিত হবে না। তাই তারা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নেন। বাঙালি মুসলিম নেতারা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বি-জাতিতত্ত্ব সমর্থন করেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়
প্রকৃত ইতিহাস চর্চার অভাবে বাংলাদেশের অনেক তরুণই পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙালি মুসলমানদের ভূমিকা সম্পর্কে খুব কম জানেন। ফলে ইতিহাসের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আজও অনালোচিত রয়ে গেছে। কেন পূর্ববঙ্গের এত বিপুলসংখ্যক মুসলমান পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন? কেন দ্বিজাতিতত্ত্ব বাংলায় এত ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছিল? পাকিস্তান আন্দোলনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতার পাশাপাশি বাঙালি নেতাদের ভূমিকা কী ছিল?

সাম্প্রতিক বাংলাদেশের প্রচলিত ইতিহাসচর্চায় এসব প্রশ্ন ক্রমশ উপেক্ষা করা হয়েছে বা গুরুত্বহীন করে দেখা হয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্ম ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্যকার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অথচ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পূর্বপাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না হলে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশেরও জন্ম হতো না।

কলকাতা দাঙ্গা
১৯৪৬ সালের ১৬ থেকে ১৯ আগস্ট কলকাতায় সংঘটিত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেশভাগ-পূর্ব ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা। এ দাঙ্গায় প্রধানত হাজার হাজার বাঙালি মুসলমান নিহত হন। একই বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে নোয়াখালীতেও আরেকটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বহু মানুষের প্রাণহানি ও ব্যাপক সম্পদের ক্ষতি হয়। অনেক বাঙালি মুসলমানের কাছে এসব ঘটনা এই বিশ্বাস আরো দৃঢ় করে যে, কেবল একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রই তাদের রাজনৈতিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত করতে পারে। এই সময়কার বাঙালি মুসলমানদের দূরদর্শিতা ও আত্মত্যাগ ছিল পুরো উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দৃঢ় সঙ্কল্পের বহিঃপ্রকাশ।

একটি অভিন্ন ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার স্মরণ
ইতিহাসকে নির্বাচিত স্মৃতির পরিবর্তে ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে মূল্যায়ন করাই শ্রেয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ছিল ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। সেই বৃহত্তর আন্দোলনে বাংলা ছিল অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বাঙালি মুসলমানরা পাকিস্তানের পক্ষে অন্যতম শক্তিশালী গণরায় দিয়েছিলেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের মাধ্যমে লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন এবং নতুন রাষ্ট্রের প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন।

এসব অবদানের স্বীকৃতি দেয়ার অর্থ অতীতের রাজনৈতিক বিতর্ককে পুনরুজ্জীবিত করা নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা এবং বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনে যারা ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের প্রাপ্য সম্মান প্রদান করা।

পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের ওপর পাকিস্তান চাপিয়ে দেয়া হয়নি; বরং পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙালি মুসলমানরা নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন।

লেখক : অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের ইমেরিটাস অধ্যাপক, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাবেক উপাচার্য এবং বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের প্রবাসী ফেলো