আশরাফ আল দীন
বাংলাদেশ সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো কার্যকর, আধুনিক ও জনমুখী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তবে প্রতিরক্ষা কেবল সামরিক শক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, কূটনৈতিক দক্ষতা, সামাজিক সংহতি এবং জাতীয় ঐক্যের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তার ধারণা বহুমাত্রিক। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা বিকাশের সামনে রয়েছে বহির্দেশীয় চ্যালেঞ্জ এবং অভ্যন্তরীণ নানা সীমাবদ্ধতা।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থার গুরুত্ব
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী দেশের প্রতিরক্ষার মূল ভিত্তি। পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), সমুদ্র নিরাপত্তায় কোস্ট গার্ড এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আমাদের প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য হলো :

ক. রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা।

খ. সীমান্ত ও সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

গ. প্রাকৃতিক দুর্যোগে জনগণকে সহায়তা করা।

ঘ. আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা ও কৌশলগত অনুশীলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করা।

ঙ. জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়নের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা।

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পথে প্রধান বাধাগুলো সংক্ষেপে নিম্নলিখিতভাবে উপস্থাপন করা যায় :

১. ভূরাজনৈতিক অবস্থান।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এ অঞ্চলে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। ফলে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা-ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

২. সীমান্ত নিরাপত্তা।

বাংলাদেশের দীর্ঘ স্থল ও সমুদ্রসীমা রয়েছে। সীমান্তে চোরাচালান, মানবপাচার, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র পরিবহন এবং সীমান্তসংক্রান্ত বিবিধ উত্তেজনা নিরাপত্তার জন্য উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে।

৩. সামুদ্রিক নিরাপত্তা।

বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের বিশাল সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। এই অঞ্চলের সম্পদ রক্ষা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং নীল অর্থনীতির (ইষঁব ঊপড়হড়সু) উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী নৌ সক্ষমতা অর্জন অপরিহার্য।

৪. সাইবার নিরাপত্তা।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাইবার হামলার আশঙ্কা বড় হুমকি। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও সরকারি তথ্য-ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইদানীং প্রতিরক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

৫. জলবায়ু পরিবর্তন।

ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি জাতীয় নিরাপত্তাকে নতুন মাত্রায় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগ প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।

জাতিগত বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা :

১. রাজনৈতিক বিভাজন।

অতিরিক্ত রাজনৈতিক মেরুকরণ জাতীয় ঐক্য দুর্বল করতে পারে। একটি বিভক্ত সমাজে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষানীতি বাস্তবায়ন তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে।

২. দুর্নীতি।

দুর্নীতি প্রতিরক্ষা খাতে সম্পদের কার্যকর ব্যবহার ব্যাহত করতে পারে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রত্যাশিত মাত্রায় উন্নীত হয় না।

৩. প্রযুক্তিগত নির্ভরতা।

উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বিদেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

৪. গবেষণা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সীমাবদ্ধতা।

দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প, গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিধি আরো সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। নিজস্ব প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে কৌশলগত স্বনির্ভরতা বাড়ে।

৫. দক্ষ মানবসম্পদ।

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে অব্যাহত আগ্রহ ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা
একটি শক্তিশালী অর্থনীতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা কঠিন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রতিরক্ষাকে পরোক্ষভাবে শক্তিশালী করে। একই সাথে প্রতিরক্ষা ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

কূটনীতির গুরুত্ব
শুধু সামরিক শক্তি নয়, কার্যকর কূটনীতিও জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম স্তম্ভ। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে পারস্পরিক সম্মান, আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব আরো সুসংহত করতে পারে।

এক্ষণে আমাদের করণীয়

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা যেতে পারে :

ক. আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি।

খ. সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করা।

গ. দেশীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা ও শিল্পের উন্নয়ন।

ঘ. সীমান্ত ও সামুদ্রিক নজরদারি আরো কার্যকর করা।

ঙ. প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো।

চ. দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো।

ছ. জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সম্প্রীতি ও নাগরিক সচেতনতা জোরদার করা।

জ. ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি আধুনিক, পেশাদার ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সামরিক শক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক সংহতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং দক্ষ কূটনীতি সমানভাবে প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত অগ্রগতি অর্জন করা গেলে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আরো সুদৃঢ় করার পাশাপাশি একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বে নিজের অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে সক্ষম হবে।

লেখক : কলামিস্ট, নিরাপত্তা বিশ্লেষক