সমসাময়িক বাংলাদেশে ২০২৪-এর গণবিপ্লবের পর এত বড় বিক্ষোভ কেউ দেখেনি। গত সোমবার গাজায় ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছে দেশ। ইসরাইলের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে বাংলাদেশ। গোটা বিশ্বের প্রতিবাদী মানুষের সাথে একাত্ম হয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় মার্কিন সমর্থিত ইসরাইলি বাহিনীর বর্বর, নৃশংস ও বীভৎস হামলার তীব্র নিন্দায় শরিক হয়েছে বাংলাদেশের আপামর জনগণ। একই সময় পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছে বিবেকবান মানুষ। গাজা ও ফিলিস্তিনে চলমান হামলা দীর্ঘকালের। সম্ভবত এই প্রথম বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত কঠিন ভাষায় গাজায় হামলার প্রতিবাদ করেছে। পররাষ্ট্র দফতরের বিবৃতিতে বলা হয় ‘নিরীহ নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানোর জন্য গাজার ঘন বসতিপূর্ণ বেসামরিক এলাকায় ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর বিমান থেকে নির্বিচার বোমা বর্ষণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ।’ ...আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে জাতিসঙ্ঘের কাছে নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের জন্য তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানাচ্ছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই বিবৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের ক্ষোভ ও নিন্দার প্রতিফলন ঘটেছে। নজিরবিহীনভাবে গত সোমবার বাংলাদেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ, সব রাজনৈতিক দল, আলেম-ওলামা ও সাধারণ জনগণ বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেয়। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস, পরীক্ষা হয়নি। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও এ প্রতিবাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। ‘The world stops for Gaza’ কর্মসূচির সাথে সংহতি জানিয়ে এ কর্মসূচি নির্ধারিত হয়। ফিলিস্তিনি অ্যাক্টিভিস্টরা কয়েক দিন আগে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের যে কর্মসূচি নির্ধারণ করে তাদের ডাকে সাড়া দিয়েই প্রতিবাদে শামিল হয় বাংলাদেশ। এসব সমাবেশ থেকে ইসরাইলের পণ্য বর্জনের আহ্বান জানানো হয়। কোনো কোনো জায়গায় হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পণ্য বর্জনের বিষয়টি ঠিক আছে কিন্তু হামলা ও লুটপাট গ্রহণযোগ্য নয়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় হামলা শুরু করে ইসরাইল। এর পর থেকে ইসরাইলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় গাজার ৫০ সহস্রাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়। মোট আহত এক লাখ ১৫ হাজার ৩৩৮ জন মানুষ। ইসরাইলি বাহিনীর অব্যাহত হামলায় পুরো গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গাজার ২২ লাখ বাসিন্দার বেশির ভাগই এখন উদ্বাস্তু। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি বর্বরতা আরো তীব্রতর, আরো বীভৎস হয়ে ওঠে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন, যার আওতায় গাজা উপত্যকাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অধীনে আনার’ প্রস্তাব দেন। তিনি গাজাকে মধ্যপ্রাচ্যের ‘রিভিয়েরা’ হিসেবে পুনর্গঠনের কথা বলেন এবং প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে বল প্রয়োগে স্থানান্তরের ইঙ্গিত দেন। এতে প্রয়োজন হবে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ অপসারণ। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই পরিকল্পনাকে ‘বিপ্লবী’ বলেন, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, কারণ এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। আরব দেশগুলোর বিরোধিতার মুখে ট্রাম্প পরে জানান, এটি কেবল একটি সুপারিশ। আরব লিগ পাল্টা প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তা প্রত্যাখ্যান করে। তবুও আলোচনার দরজা খোলা রাখার ইঙ্গিত দেন ট্রাম্প।

ট্রাম্পের এই ঘোষণা নির্লজ্জভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ। নির্বাচিত হওয়ার এক পর্যায়ে ট্রাম্প বলেছেন, মুসলমানরা আমাদের ঘৃণা করে। আসলে এই অর্ধ উন্মাদ ব্যক্তি নিজেই তীব্রভাবে ইসলামোফোবিয়ায় আক্রান্ত। তিনিই মুসলমানদেরকে ঘৃণা করেন। তার বক্তৃতা-বিবৃতি মুসলিমবিদ্বেষী ধারায় পরিপূর্ণ। প্রথমবার যখন তিনি প্রেসিডেন্ট হন তখন ছয়টি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করেন। ইহুদিবাদের পরম মিত্র এই ব্যক্তি একই সাথে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আরব রাষ্ট্রগুলোকে ইসরাইলের তাঁবেদারে পরিণত করার প্রয়াস নেন। তাতে তিনি বেশ সফলও হন। কয়েকটি আরব রাষ্ট্র ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়। পবিত্র ভূমির হিফাজতকারীরাও এতে শামিল হয়। গাজায় হামাস যুদ্ধ শুরু না করলে হয়তো বা তাদের স্বীকৃতিও ইতোমধ্যে আদায় হয়ে যেত। ট্রাম্পের এই গাজা উপত্যকা থেকে মুসলিম জনসংখ্যা নিধন ও উচ্ছেদ পরিকল্পনা তাৎক্ষণিক মনে হতে পারে। ইতিহাসের গহীন গভীরে এই নীলনকশা নিহিত। মূলত গোটা ফিলিস্তিন থেকে এই কৌশলে মুসলিম উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। সে এক নির্মম ইতিহাস।

কুরআনে বলা হয়েছে ‘আমি বনি ইসরাইলকে কিতাবে পরিষ্কার বলে দিয়েছি, তোমরা পৃথিবীর বুকে দুবার অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং অত্যন্ত বড় ধরনের অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে।’ (সূরা বনি ইসরাইল-৪) ইতিহাস সাক্ষ্য বনি ইসরাইলরা প্রথমত আল্লøাহর অনুগ্রহ পাওয়া জাতি হলেও পরবর্তীকালে গোমরাহিতে লিপ্ত হয়। পরবর্তী সময়কালে বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ইহুদিরা ক্রমে আরব ভূমি থেকে বিতাড়িত হতে থাকে। আধুনিক সময়কালে তারা বিশেষত জার্মানি ও রাশিয়ায় বসতি গড়ে। অপ্রিয় সত্য এই যে, তারা উভয় দেশ থেকে একই কারণে নিপীড়ন ও উচ্ছেদের শিকার হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে তারা তাদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমির দাবি তোলে। ১৮৯৭ সালে তাদের নেতা থিওডোর হেডজল আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ইহুদি সম্মেলন আহ্বান করেন। সেই সময় থেকেই ইহুদি গোষ্ঠীর নিজস্ব বাসভূমির আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের প্রাক্কালে ব্রিটিশ তথা পাশ্চাত্য অর্থে ও সামর্থ্যে ইহুদি সহায়তা গ্রহণ করে। প্রথমত ইহুদিদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে মালাগাছি দ্বীপ এবং আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের প্রস্তাব দেয়া হয়। তা তারা প্রত্যাখ্যান করে। ইহুদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াইজম্যান জেদ ধরেন, তাদের পূর্বপুরুষের হারানো আবাসভূমি ফিলিস্তিনেই তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে হবে। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর ইহুদিদের প্রতিশ্রুতি দেন, আরব ভূমিতেই তাদের পৃথক রাষ্ট্র গঠনের অধিকার দেয়া হবে। ইতিহাসে এটি বেলফোর ঘোষণা বলে চিহ্নিত। এরপর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিরা ছলে-বলে-কলে কৌশলে ফিলিস্তিনে বসতি গড়তে শুরু করে। সহজ সরল আরবদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তারা ভূমি দখল করতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর ফিলিস্তিন ব্রিটিশদের তথাকথিত জিম্মাদারিতে ন্যস্ত ছিল। তারা ইহুদিদের সুযোগ করে দেয়। ১৯৪৮ সালে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে স্বাধীন সার্বভৌম ইহুদি রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়। সাথে সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ পাশ্চাত্য একে স্বীকৃতি দেয়। পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও স্বাচ্ছন্দ্যে ইহুদি ধর্মের ভিত্তিতে ইসরাইলকে মেনে নেয়। ফিলিস্তিনের মুসলিম তথা আরব জনগোষ্ঠীকে বিতাড়ন করা হয়। গোটা ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী উদ্বাস্তু জাতিতে পরিণত হয়। পার্শ্ববর্তী আরব দেশগুলোতে এসব জনগোষ্ঠী আশ্রয় নেয়। এ দিকে ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালে আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে চারটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় সব যুদ্ধেই আরবদের সম্মিলিত শক্তি পরাজিত হয় ইসরাইলের কাছে। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক পরাজয় ঘটে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে। এ সময় ইসরাইল পুরো সিনাই উপদ্বীপ, সিরিয়ার গোলান উপত্যকা ও জর্দান নদীর পশ্চিম তীর পর্যন্ত দখল করে নেয়। পরবর্তীকালে তথাকথিত স্বায়ত্তশাসনের নামে গাজায় কিছু লোক বসবাসের অনুমতি পায়।

বর্তমানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অংশ গাজা উপত্যকা পূর্বে, অটোমান সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং মিসরের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল গাজা দখল করে এবং ১৯৯৩ সালে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ অঞ্চলটির প্রশাসন গ্রহণ করে। ২০০৫ সালে ইসরাইল গাজা থেকে নিজস্ব সেনা প্রত্যাহার করে এবং সেই বছরই স্বাধীনতাকামী হামাস সংসদীয় নির্বাচনে জয়ী হয়। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে এলেও সমাধান আনতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের পর থেকে গাজা উপত্যকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত বহু নাগরিক নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে সক্ষম হয়েছে। গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের আহ্বান ইসরাইলি চরম-ডানপন্থীদের পুরনো দাবির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই ফিলিস্তিনি অঞ্চলকে জাতিগতভাবে পরিষ্কার করে বিদেশী বসতির জন্য জায়গা করে দেয়ার দাবি জানিয়ে এসেছে।

২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র গাজা উপত্যকা ‘নিজের দখলে নেবে’ এবং পুনর্গঠন করে তা ‘বিশ্বের মানুষের’ জন্য খুলে দেবে, যেখানে ফিলিস্তিনিরা আর ফিরে যেতে পারবে না। তিনি বলেন, ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে গাজায় কর্মসংস্থান ও আবাসনের সুযোগ তৈরি করা হবে। বিবিসি জানায়, গাজায় পাঁচ কোটির বেশি টন ধ্বংসাবশেষ রয়েছে, যা পরিষ্কার করতে ২১ বছর লাগতে পারে।

পরবর্তী দিনে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু সদস্য বলেন, গাজাবাসীকে স্থানান্তর সাময়িক হবে। নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের ফিরে আসার পক্ষে মত দেন। ৯ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গাজা কিনবে কিন্তু পরে বলেন কিছুই কিনবে না; বরং তা ‘নিজেদের কাছে রাখবে’। জাতিসঙ্ঘ একে জাতিগত নির্মূলের রূপ বলে মন্তব্য করে।

ট্রাম্পের বক্তব্যগুলো পরস্পরবিরোধী ছিল; কখনো গাজাবাসীকে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের কথা বলেন, আবার কখনো বলেন কাউকে উচ্ছেদ করা হবে না। এ পরিকল্পনার পেছনে অর্থনীতিবিদ জোসেফ পেলজম্যানের একটি নথি ছিল। গাজাবাসীর জন্য সম্ভাব্য পুনর্বাসনের স্থান হিসেবে সিরিয়া, সুদান, মরক্কো, পুন্টল্যান্ড ও সোমালিল্যান্ডের কথা বিবেচনা করা হয়, যদিও বেশির ভাগ দেশ এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ট্রাম্পের এ পরিকল্পনায় মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে পৃথিবীর মালিক মোক্তার মনে করেন। তিনি নিজ দেশে ইতোমধ্যেই ব্যাপক বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়েছেন। পৃথিবীর মানুষও তাকে ধিক্কার দিচ্ছে। কিন্তু তার মানবিক চেতনার উদ্রেগ হয়েছে বলে মনে হয় না।

হাজার হাজার মাইল দূরের ফিলিস্তিনি তথা গাজাবাসী মুসলমানদের জন্য বাংলাদেশের কোটি মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসা। বাংলাদেশের মানুষেরা শুধু ক্ষোভ জানিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, সময়ে সময়ে তারা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ইসরাইলের বিপক্ষে যুদ্ধ করেছে ফিলিস্তিনে। বাংলাদেশের মানুষের আবেগ, আক্ষেপ ও রক্তে ফিলিস্তিনের মাটি শিক্ত হলেও, শুধু আরব অনৈক্যের জন্য বারবার মার খেয়েছে ফিলিস্তিনি জনগণ। আজো যখন গাজা তথা ফিলিস্তিনে রক্ত ঝরছে তখন আরব লিগ ও ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসি কেবল প্রস্তাবনা নিয়েই ব্যস্ত। তাদের উত্থাপিত বিকল্প প্রস্তাবনা ট্রাম্প তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই নাকচ করেছে। সম্মিলিতভাবে শক্তি প্রয়োগের কোনো সম্ভাবনা মুসলিম বিশ্ব দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে। পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষে তারা এতই নিমজ্জিত যে মুসলিম ঐক্যের বাণী তাদের কাছে নিরর্থক।

তবুও বাংলাদেশের মানুষ কাঁদে। ১৯৪৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যখনই ফিলিস্তিনি ভাইদের ওপর ইসরাইল হামলা চালিয়েছে ততবারই বিক্ষুব্ধ মানুষ প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, আবেগ ও বেদনায় জনগণ শরিক হয়েছে ততটা কার্যকরভাবে কোনো সরকারই পদক্ষেপ নেয়নি; বরং বিগত ১৫ বছরে আওয়ামী সরকার ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি দৃশ্যমান সহানুভূতি প্রকাশ করলেও অদৃশ্যভাবে ইসরাইলকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছে। গোটা বিশ্বব্যাপী ইসরাইল তথা এর গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সম্প্রসারিত রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর সবচেয়ে কার্যকর ও শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি মোসাদ। ইসরাইলের সুনির্দিষ্ট নীতি হচ্ছে পৃথিবীর যেখানেই হোক মুসলিম স্বার্থে, মুসলিম শক্তিকে ও মুসলিম সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করা। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, এক-এগারোর পরবর্তীকালে বাংলাদেশে জঙ্গি নাটকের যে অবতারণা তার মূলে রয়েছে মোসাদ। এই মোসাদ আওয়ামী সরকারকে সব রকমের সহযোগিতা দিয়ে ইসলাম ও মুসলিম রাজনীতিকে নির্মূল করে। আর এসব করা হয় প্রতিবেশীর প্রযত্নে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ফোনে আড়িপাতার যন্ত্র/গোপন তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা ‘পেগাসাস’ ক্রয় করে পূর্ব ইউরোপীয় দেশ রোমানিয়া থেকে যা মূলত ইসরাইলে তৈরি। ক্ষমতায় আরোহণ ও টিকে থাকার প্রতিদানস্বরূপ আওয়ামী লীগ সরকার পাসপোর্ট থেকে ইসরাইলের প্রতি আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে দেয়। বিশ্বাস করা হয় যে, এখনো এই দেশে মোসাদ সক্রিয় আছে। আওয়ামী আমলে তারা কচ্ছপ গতিতে একটু-আধটু মুখ বের করেছিল। এখন তারা গুটিয়ে গেছে। গোপনে গোপনে কলকাঠি নাড়ছে। সুতরাং সাধু সবধান।

লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও

রাজনীতি বিভাগ,

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Mal55ju@yahoo.com