লিনা আকতার

খাদ্যে ভেজাল নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি যা বিশ্বব্যাপী বিপুলসংখ্যক মানুষকে প্রভাবিত করছে। ইচ্ছা করে ক্ষতিকারক বা নিম্নমানের পদার্থ যোগ করে খাদ্যের মান কমানোই হচ্ছে খাদ্যে ভেজাল। ভেজাল রাসায়নিক, জৈবিক ও ধাতব হতে পারে। ভেজাল খাদ্যে এমন কিছু পদার্থ যোগ করা হয়, যা পণ্যের গুণমান, বিশুদ্ধতা এবং নিরাপত্তা প্রভাবিত করে। খাদ্যে ভেজাল করতে সাধারণত কিছু প্রকার রয়েছে, যেমন- কিছু খাবারে পানি দিয়ে পাতলা করা হচ্ছে। যেমন- জুস, দুধ। এছাড়া নিম্নমানের উপাদান দেয়া ও রাসায়নিক সংযোজন, কীটনাশক, কৃত্রিম রঙের ব্যবহার এবং ভুল লেবেলিং করে খাবার প্রস্তুত করা হয়।

ভেজাল খাবার খাওয়ায় শরীরে বিষাক্ত পদার্থ, কীটনাশক, ভারী ধাতু এবং কৃত্রিম রঙের মতো দূষণকারী পদার্থ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের শরীর আরো বেশি ক্ষতি করছে। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে। এছাড়া ভেজাল খাবার গ্রহণে শিশুদের অল্প বয়সে স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে ব্যাঘাত ঘটতে পারে; যা শিশুর স্মৃতিশক্তি, মনোযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। শিশুরা নিয়মিত ভেজাল খাবার গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যগত জটিলতা তৈরি করতে পারে যেমন- ডায়াবেটিস, হার্ট, লিভারের সমস্যা ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে।

ভেজার খাদ্যে থাকা কৃত্রিম রঙ, স্বাদ ও সংরক্ষণকারী মতো পদার্থ হজম প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে, যার ফলে পুষ্টির শোষণ কম হয়। এর ফলে খাদ্য গ্রহণ করা সত্তে¡ও পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। একইসাথে অন্ত্রের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এছাড়া ভেজাল খাবার আমাদের খাদ্যতালিকায় পুষ্টির ভারসাম্য ও পুষ্টি শোষণ কমাতে পারে। তাই দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত ভেজাল খাবার খেয়ে লাখ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। ভেজাল খাদ্য খাওয়ায় দেশে কিডনি, হেপাটাইটিস, লিভার ও ফুসফুস সংক্রমণের রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। ফুটপাথ থেকে শুরু করে অভিজাত হোটেল রেস্টুরেন্ট বা নামীদামি ব্র্যান্ডের পণ্যও এখন ভেজালমুক্ত নয়। তাই খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ নিয়ম মেনে হতে বলে, পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

ভেজাল খাবার শরীরে কী ক্ষতি করছে

দৈনন্দিন জীবনের খাবার যেমন- মুড়ি, দুধ, মৌসুমি ফল, ডাল, হলুদ, মশলাতে বিভিন্ন ফরমালিন ব্যবহার করছে। গরুর শরীরে পিটুইটারি ইনজেকশন দিয়ে দুধের পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে। এটি একরকম ভেজাল। শাকসবজিতে কপার সালফেট পানিতে দিয়ে ডুবিয়ে রাখা হয় তাজা রাখতে, মৌসুমি ফল আম, লিচুু, তরমুজ, জামে দেয়া হয় কার্বাইড ফরমালিন, তরমুজের ভেতরে দেয়া হয় তরল পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট যাতে তরমুজ লাল থাকে। খেশারির ডাল ব্যবহার করা হয় বেসনের তৈরিতে, কফি পাউডারের সাথে মেশানো হয় তেঁতুলের বিচির গুঁড়া, মশলায় দেয়া হয় ইটের গুঁড়া, হলুদে লেড ক্রোমেট বা লেড আয়োডাইড ইত্যাদি। ফরমালিন অত্যন্ত বিষাক্ত বলে নিয়মিত খেলে শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগ হওয়ার আশঙ্কা রাড়ে। এসব ভেজাল খাবার ভেলে খাদ্য পরিপাকে বাধা, পাকস্থলীতে ক্ষতি করবে, যকৃতের এনজাইম নষ্ট করবে এবং কিডনি ধ্বংস করবে। এর ফলে গ্যাস্ট্রিক আলসার, লিভার ও কিডনির জটিল রোগ দেখা দেবে। এছাড়া ভেজাল খাবার গ্রহণে নারীদের মাসিক ও পিরিয়ডে সমস্যা, গর্ভবতী মায়েদের জন্য ক্ষতিকর ও শিশু হতে পারে বিকলাঙ্গ।

খাবারে কীটনাশকের উপস্থিতিও পাওয়া যায় যা চোখ ও ত্বকের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা, পাশাপাশি বমি, চুলকানিসহ নানা জটিলতা। এসব ফরমালিন ভেজালযুক্ত খাবার খেয়ে দিন দিন মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এসব খাবার খেয়ে পেট ভরলেও দিন শেষে এসব খাবারের যেমন স্বাদ পাওয়া যায় না, তেমনি মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগবে। এছাড়া এসব খাবার খাওয়ানোর কারণে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গিয়ে উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না, শিশুদের পাশাপাশি বয়স্ক-জনিত ব্যক্তিদের নানা মেটাবলিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে যা ওষুধের পেছনেই চলে যাচ্ছে তাদের অর্থ। বর্তমানে মানুষের স্বাস্থ্যগত সমস্যা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে মানুষ পঙ্গু হচ্ছে জীবন।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি বছর ফরমালিনযুক্ত খাবার খেয়ে তিন লক্ষাধিক লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত, প্রায়শই দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং দুই লাখ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়েছে এবং গর্ভস্থ শিশু বিকলাঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। খাবারই হতে পারে ওষুধ সেটি যদি মাথায় রেখে খাবারটি নিরাপদ গ্রহণ করতে পারি তাহলে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে অনেক রোগ মোকাবেলা করতে পারি। তাই ভেজালমুক্ত খাবার প্রতিরোধ করতে সরকার, জনগণসহ সর্বোপরি এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে।

খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে আইনে ভারী জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল ও গুরুতর ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের ব্যবন্থা করতে হবে। প্যাকেজিং লেবেল যেমন- মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ এবং উৎপাদনের তারিখ দেখে খাবার গ্রহণ করবেন। খাবার বেশি চকচক হলে পরীক্ষা করুন। বাজার থেকে আনা ফল ও শাকসবজি ভিনেগার বা লবণ পানিতে ভিজিয়ে রাখুন।

ফাস্টফুড দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রভাবিত করে

ফাস্টফুড বলতে প্রক্রিয়াজাত খাবার বোঝায়; যা খুব দ্রত প্রস্তুত করা হয়। এর মধ্যে ডিপ ফ্রাই, গ্রিলিং বা মাইক্রোওয়েভে আগে থেকে প্রস্তুত করা উপাদান যা প্রায়শই আগে থেকে রান্না করা হয়। সাধারণত ফাস্টফুডের মধ্যে রয়েছে বার্গার, ফ্রাই ডোনাট, হটডগ, ফ্রায়েড চিকেন, ফিশ অ্যান্ড চিপস, পিৎজা, কাবাব ও সাবমেরিন স্যান্ডউইচ। এগুলোতে সাধারণত স্যাচুরেটেড ফ্যাট, চিনি, অত্যন্ত প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট ও ক্যালরি বেশি থাকে। এগুলোতে সাধারণত পুষ্টি, ভিটামিন, খনিজ ও ফাইবার কম থাকে। ফলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে আমাদের শরীর প্রভাবিত করে এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমাতে পারে।

ফাস্টফুডযুক্ত খাবারে অতিরিক্ত, চিনি, চর্বি এবং লবণের পরিমাণ বেশি থাকায় এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক করে তোলে, ফলে দেহে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া ফাস্টফুড খেলে রোগ প্রতিরোধক কোষে এপিজেনেটিক পরিবর্তন করতে পারে; এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। ফাস্টফুড উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার হওয়ায় কোষ যা গুরুত্বপূর্ণ রোগ প্রতিরোধক কোষকে ধীর করে দিতে পারে। সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষমতা হ্রাস পায়। এ ছাড়া উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার অন্ত্রের প্রতিরক্ষামূলক প্রোটিন দ্রুত হ্রাস করতে পারে; যা শরীরের প্রতিরক্ষা ক্ষমতাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

শুধু তাই নয়, ফাস্টফুড মানব দেহে আরো নানাভাবে প্রভাবিত করে। যেমন- ফাস্টফুডে লবণের পরিমাণ বেশি থাকে, তা নিয়মিত গ্রহণ করলে শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়- যা রক্তাচপ, হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলর, কিডনি রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।

ফাস্টফুডে ফাইবারের ঘাটতি থাকে, যা আপনার মল নরম করতে পর্যাপ্ত নয়। এতে কোষ্ঠকাঠিন্য, পাইলস ও হার্নিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ফাস্টফুডে ক্যালরির পরিমাণ বেশি থাকায় এসব খাবার বেশি পরিমাণে খেলে ওজন দ্রুত বাড়তে পারে। এছাড়া ঘন ঘন ফাস্টফুড খেলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে; ওজন বাড়তে পারে। আর অতিরিক্ত ওজন হাড়, জয়েন্টে ব্যথার সৃষ্টি করে। সেই সাথে আর্থ্রাইটিস ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

ফাস্টফুডে সাধরণত পাওয়া যায় উচ্চ প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট, যার গ্লাইসেমিক সূচক বেশি, যার অর্থ- এগুলো দ্রুত চিনিতে রূপান্তরিত হয়। এতে শরীরে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে। এটি অগ্ন্যাশয়ে বেশি পরিমাণে ইনসুলিন হরমোন তৈরি করতে পারে। সময়ের সাথে সাথে রক্তে শর্করার মাত্রার এই বারবার বৃদ্ধি শরীরকে ইনসুলিনের প্রতি কম সংবেদনশীল করে তোলে; যা পরবর্তীতে টাইপ-টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। টাইপ-টু ডায়াবেটিস মানব দেহের একাধিক অঙ্গ এবং সিস্টেমকে ক্ষতি করতে পারে- যার মধ্যে চোখ, কিডনি ও স্নায়ু, পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।

ফাস্টফুডের উচ্চ পরিমাণে চিনি এবং প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট যে কাউকে ক্লান্তবোধ করতে পারে; এতে মেজাজ খিটখিটে হতে পারে। এছাড়া ফাস্টফুডে ভিটামিন, খনিজ ও পুষ্টির অভাবও মেজাজ খারাপ করতে পারে।

ফাস্টফুডে লবণের পরিমাণ উচ্চ মাত্রায় থাকায় ত্বককে পানিশূন্য করে তুলতে পারে, এতে ত্বক শুষ্ক এবং চুলকানিযুক্ত হয়ে পড়ে, অন্যদিকে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের উচ্চমাত্রা হরমোনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা ব্রণের ঝুঁকি বাড়ায়।

উচ্চ মাত্রার চিনি ত্বকের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ চিনি কোলাজেনের গঠন নেতিবাচকভাবে পরিবর্তন করে, এটি একটি প্রোটিন যা ত্বককে স্থিতিস্থাপক রাখতে সাহায্য করে। যখন কোলাজেন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন ত্বকও বয়স্ক দেখাবে।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় বাড়ায়

ফাস্টফুডের প্রভাব এড়াতে নিয়মিত খাবারেরর পরিবর্তে মাঝে মধ্যে ট্রিট হিসেবে নেয়া যেতে পারে। সবসময় তাজা শাকসবজি ও ফল, চর্বিহীন প্রোটিন, গোটা শস্য ও ফাইবারসমৃদ্ধ একটি স্বাস্থ্যকর সুষম খাদ্যাভাস অনুসরণ করা যে কারো জন্য ভালো। এছাড়া খাবারের পরিমাণের দিকে মনোযোগ দেয়া দরকার। উচ্চ প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে কম পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করতে হবে। কারণ, কম পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত খাবার প্রচুর পরিমাণে শস্যদানা এবং ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা হয়। এটি দীর্ঘসময় পূর্ণ রাখতে সাহায্য করবে এবং অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

লেখক : পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর