চার দিকে ভয়ের কুয়াশা। শঙ্কা আশঙ্কারা আবর্তন থেকে বের হতে পারছে বলে মনে হয় না চর মনজিতপুরের মনোহর মোল্লার। ভয় ও শঙ্কা শুধু তার উপকূলীয় জনপদে নয়, দেশেও নয় সারা দুনিয়ায় সর্বোচ্চ বাড়ছে বৈ কমছে না। আর্থ-সামাজিক পরিবেশের পথ এতটা পিচ্ছিল হচ্ছে, প্রতিদিন প্রত্যেককে পা পিছলে পড়ার ভয় পাইয়ে দিচ্ছে, অজানা শঙ্কা কাটছে না কারো। গত পরশু বান্দরবানের অতি সচেতন সম্ভ্রান্ত এক হাতির ভূমিধসে পাহাড় থেকে পা পিছলে পড়ে সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় আকারে। যাদের ঘরে খাবারদাবারের সংস্থান আছে, যাদের আয়ের উৎস নিয়ে যেকোনো সংস্থার প্রশ্ন তোলা বাতুলতা মাত্র। তারা খিচুড়ি ভুনা গোশত রান্না করে খাচ্ছে। উপজেলা সদরে, নতুন প্রশাসকের পৌর পিতার বাংলোয়, নগরে, মহামহিম মহানগরে। কিন্তু মহানগরের নাগালের মধ্যে নিম্নাঞ্চলে, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম কিংবা উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম, নীলফামারীতে বানভাসি মানুষদের সংসারে সম্বল বন্যায় নিঃশেষ হয়ে চলছে। বছর দুই আগে ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রামে ব্যাপক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত, বন্যা মোকাবেলায় সচেতনতা বৃদ্ধি, নিম্ন আয়ের মানুষদের আয় বর্ধন তথা জীবিকা উন্নয়নের নামে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। ওই প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে এবার নতুন উদ্যমে আক্রমণ শুরু করেছে আগাম বন্যা। সিরিয়া, ইথিওপিয়া, ফিলিস্তিন, লেবাননে অসংখ্য মানুষ ও শিশু প্রতিদিন উদ্বাস্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশে কখনো করোনা, কলেরা, হাম ও ডেঙ্গুতে মানুষ মারা যাচ্ছে। শান্তি ও স্বস্তি কোথায়? সবখানে ঠেকে শেখার শেষ কোথায়?
যেমন সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ আইনের নাকের ডগায় ভয়াবহ অন্যায় হিসেবে আগে থেকে বাড়ছে। পরিচিত হতে হতে নিত্যনতুন আপদ বিপদের হেতুতে পরিণত হচ্ছে। প্রতারণার ফাঁদ পাতার স্মার্টনেস দেখলে বিস্মিত হতে হয় মাত্র দুই বছর আগের কথিত স্মার্ট বাংলাদেশে। সাইবার ক্রাইম, মব ক্রাইম, বখাটেদের বাচালতা সবখানে নিত্যনতুন অবয়বে ও অবকাঠামোয় বেড়ে উঠছে। গত বুধবারে সমজাতীয় দু’টি ঘটনা ঘটে। এ মহানগরে সকালে জনৈক মাঝারি ব্যবসায়ীকে মোবাইলে ফোন করলেন এআই সৃষ্ট ফেক ছবি সংবলিত একটি বাহিনীর মধ্য পর্যায়ের কর্মকর্তা। নাম পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘আপনার মোবাইল নম্বর হ্যাক করে এটি থেকে আপত্তিকর অনেক কিছু ছড়ানো হচ্ছে।’ ব্যবসায়ী বললেন, তাতে আমি কি-ইবা করতে পারি? জবাব এলো আপনার মোবাইল সেটিংটা মেরামত করা লাগবে। এ ব্যাপারে আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পারি। ব্যবসায়ী এ ধরনের ধান্ধাবাজি সম্পর্কে আগে জেনেছিলেন। তিনি বললেন, ‘তা আপনার সাহায্যে আমি কেন নেব। যদি নিতে হয় আপনি আসুন আমার অফিসে অথবা আমি আপনার অফিসে আসতে পারি। আপনি নিজে যে হ্যাকার নন তা বুঝব কি করে?’ এরপর আর আলাপন চলেনি তাদের মধ্যে।
কিন্তু সকালের এমন সংলাপ সহায়তার খবর জানা ছিল না বিকেলে একজন সাবেক উচ্চপদস্থ আমলার। যিনি মানুষকে ভুল শুধরাতে সদা উপদেশ বিলান, সব সময় সাবধানতা অবলম্বনের অবকাশ খোঁজেন। তাকে ফোন করলেন একটি স্বনামধন্য সংস্থার পক্ষ থেকে। তাদের লোগো ফুটে উঠল মুঠোফোনের পর্দায়। বললেন, আপনার ওয়াটসআপ মনে হয় হ্যাক হয়েছে, নাম বললেন দু’জনের। তাদের চেনেন কিনা জানতে চাইলেন। বললেন, তারা সেখানে একটি গ্রুপ খুলে ঊর্ধ্বতনদের নামে গালিগালাজ ছড়াচ্ছে। সাবেক আমলা অতি মুনশিআনায় উপস্থাপিত বিষয়টি জেনে বিব্রত হলেন। অপরপ্রান্তের বিশেষ পরিচয়দানকারীর কণ্ঠস্বর এমন দৃঢ় ও দায়িত্বশীল মনে হচ্ছিল যে, তিনি সম্মোহিত হয়ে তার কথামতো— মোবাইলের নিচের তিনটি ডট চাপুন, তারপর এটা ওটা কোড নম্বর বসাতে বললেন। তিনি তাই তাই করলেন। শেষে উপদেশ দেয়া হলো স্যার ৩ ঘণ্টার জন্য আপনি মোবাইল অফ করে দিন। তাহলে হ্যাকারকে ধরতে পারব। সাবেক আমলা বশংবদ উপদেশ পেয়ে তাই-ই করলেন। ১ ঘণ্টার মধ্যে চারদিক থেকে ফোন আসা শুরু করল তার পরিবারের সদস্যদের কাছে। তিনি কেন ৩১ হাজার টাকা পাঠানোর অনুরোধ সংবলিত মেসেজ পাঠাচ্ছেন তার সব কনটাক্ট নম্বরে। ইতোমধ্যে ফোন খুলে দেখা গেল তার ওয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে মাত্র ৩১ হাজার টাকা বিকাশে চেয়ে ম্যাসেজ গেছে সবার কাছে। তার ফোন বন্ধ পেয়ে অনেকে যাচাই করতে পারছেন না। তিনি তাজ্জব বনে গেলেন। সম্মোহিত বোকামির খেসারত হিসেবে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর হ্যাক হয়েছে সেই সুন্দর সাবলীল সিলেকশন গ্রেড প্রতারক দ্বারা। আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স ওরফে এআই আর তার শরিক চ্যাট জিপিটি আজকাল কী না করতে পারছে। সুবচনকে নির্বাসনে পাঠাতে পারছে, নীতি নৈতিকতা কবর দিচ্ছে, জানাজা পড়াচ্ছে সৃজনশীলতার। প্রতারণার ফাঁদ পাতা হচ্ছে হরহামেশা, কতক্ষণ সাবধান থাকা যাবে? ভোল পাল্টাচ্ছে প্রতারক চাঁদাবাজ ছোট বড় মাঝারি সবাই। এসব ঠেকে শিখতে শিখতে বেলা শেষ। পথের পাঁচালীর ইন্দির ঠাকরুনের মতো গাইতে হচ্ছে ‘বেলা যে গেল সন্ধ্যা হলো হরি পার করো আমারে’।
এই অতি সম্প্রতি পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন বেশ কয়েকজন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব কবি আল মুজাহিদী, মুক্তবুদ্ধি চিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, বুয়েটের বরেণ্য ভিসি প্রফেসর এম এইচ খান, পাপেট প্রবর্তক সব্যসাচি শিল্পীসত্তা মোস্তফা মনোয়ার প্রমুখ। তাদের চিনতাম, কাছে থেকে দেখেছি। তারা চিরতরে চলে গেলেন। সেদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন সহপাঠী সেকেন্দার সরদার, ছোট খালু মোজাম্মেল গাজী, প্রতি মিনিটে কেউ না কেউ চলে যাচ্ছেন। চিরবিদায় নিয়ে চলে যাওয়া থেমে নেই। যারা পরকালে বিশ্বাস করেন না, শুধু ইহকাল নিয়ে ব্যাপৃত ছিলেন তারাও রক্ষা পাননি চলে যাওয়া থেকে। সবাইকে যে সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে চলে যেতে হবে; এ ভয় ভাবনারা মনের আঙিনায় ঠাঁই পেয়েও পাচ্ছে না। তাই যদি হতো তাহলে চারদিকে এই যে অন্যায়-অনিয়ম অনৈতিকতার প্রবৃদ্ধি এত ঘটত না। এটা ভাবার বা উপলব্ধির চৌহদ্দিতে আসা দরকার যে, যারা পরপারে পাড়ি দিয়েছেন জীবদ্দশায় তারা অনেক কিছু করতে চেয়েছিলেন। সৃজনশীলতায় সমর্পিতচিত্ত হতে, সুশাসন প্রতিষ্ঠায়, মুক্তবুদ্ধি চর্চা করে আর্থ-সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে ভয়কে জয় করতে শঙ্কাদের তাড়াতে। কিছুটা পেরেছিলেন। কিন্তু পুরোপুরি পারেননি। তারা মৃত্যুর সময়ও জেনে গেছেন, সবার মধ্যে জমে থাকা ভয় কাটেনি। অবিচারের বিচার চেয়ে শেষ দেখে যেতে পারেননি। বিলেতের কবি টমাস গ্রে শহরের উপকণ্ঠে এক গোরস্থানে গেলেন। সেখানে পারলৌকিক জগতের অগণিত বাসিন্দাদের জন্য গির্জার ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। তিনি অনুভব করলেন— এখানে জন মিল্টনেরা ঘুমিয়ে আছে অর্থাৎ একসময় মিল্টনের মতো মানুষেরা কত কিছু করতে চেয়েছিলেন। মিল্টন প্যারাডাইজ লস্টের মতো মহাকাব্য রচনা করেছিলেন ইত্যাদি। কিন্তু আজ তিনি চিরতরে মিউট (নির্বাক)।
ভয় ও শঙ্কারা বাড়ছে কেন, কীভাবে? আজকাল যেকোনো পিচ্চি প্রকৃতির ষড়যন্ত্র ঝুট ঝামেলারা গ্রাম্য সালিশে না গিয়ে সবাই সরাসরি কোর্টে চলে যাচ্ছে। কোর্ট থেকে থানা। থানা হয়ে পুলিশের হাতে। আর জমিজমাসংক্রান্ত অভিযোগগুলো কোর্ট থেকে তদন্তের জন্য ভূমি অফিস, ভূমি অফিস নায়েবের কাছে পাঠাচ্ছে। নায়েব পক্ষে বা বিপক্ষে রিপোর্ট দিতে টাকা চাচ্ছে। অর্থাৎ মোটা টাকা পেলে সত্য মিথ্যা রিপোর্ট দিতে পারবে। জনসেবা এখন ক্ষৈত্রিক পর্যায়ে ক্ষমতার কাছে এমনভাবে ইজারা দেয়া হয়েছে যে নায়েব, নায়েব থেকে ভূমি অফিস, তারপর উপরে সবাই। সবাই তার উপর, তার উপর করতে টাকার খেলায় বিপিএলের মতো ফুর্তিতে কোটি কোটি টাকার বিকিকিনি করার খেলায় মেতেছে; যেন গোটা সুশীল সেবক সমাজ।
চর মনজিতপুরের মনোহর মোল্লা মহাবিপদে আছেন। তিনি নিজে অন্যরে দু-একটা ভালো কথা শোনাতে গিয়ে নিজেই অন্যের কূট কথার মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন। লোকের দোষ ধরতে গিয়ে অন্যরা তার দোষ খুঁজে বের করে তাকে ফাঁসাতে চেষ্টা করছে। গ্রেশামস ল অনুযায়ী, সমাজে মনোহর মোল্লাদের (গুড মানি) দাঁড়াতে দিচ্ছে না দুষ্ট- দুষ্কৃতকারী- দুর্নীতিবাজরা (ব্যাড মানি)। ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়— এমন একটি মহাজন বাক্য শুনে অভ্যস্ত সবাই এখন ভেবে পায় না, কেন এমন হলো পরিবেশ পরিস্থতি। ব্যক্তিগত স্বার্থবোধ জাতীয় স্বার্থবোধের ভেতর পুরতে গিয়ে জাতীয় স্বার্থবোধ ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে অসহায় হয়ে যাচ্ছে। বড় চোরকে ধরার নাম করে যেসব কড়া কড়া আইন; তা বড় চোরের বেলায় প্রয়োগ না হয়ে পুঁচকে চোর এমনকি নিরীহ ব্যক্তিবর্গের ওপর প্রয়োগ ও প্রযোজ্য হচ্ছে। আইনের শাসনের শেষ কোথায়, কোথা থেকে শুরু, কার জন্য আইন, কার জন্য প্রয়োগ ও প্রযোজ্য তা বোঝার হেরফেরে পড়ে যাচ্ছে।
প্রকাশ্যে গুলি করে খুনি নিরাপদে পালিয়ে যাবে, এমনকি তাকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করা হবে, কেউ না কেউ তাকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেবে এ কেমনতরো বেকায়দা পরিবেশ। রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে গেল খুনি! এর দোষ ওর দোষ ধরা যেতে পারে; কিন্তু দাগি আসামি নাকের ডগা দিয়ে পালিয়ে যাবে। সবাই যেন বলছে ‘আমার বলার কিছু ছিল না, না গো আমার বলার কিছু ছিল না’। আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কর্তৃপক্ষের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কেন। সর্ষের মধ্যে ভূত থাকবে কেন, ভূত তাড়াতে ভূতকাণ্ড হবে কেন? কেন সব কিছু পরিষ্কার করতে গিয়ে বাধা আসবে— ভিন্ন ব্যাখ্যা আসবে? গোটা দেশ ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধকরণে সংশয় সন্দেহের জঞ্জাল বড় বেকায়দা পরিবেশ সৃষ্টি করে। থাকতে পারে বশংবদ সমস্যা। কিন্তু সেগুলো মোকাবেলায় চাই পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ। নিজেদের মধ্যেকার ভেদাভেদ ভুলে সব বিষয়ে ঐকমত্যের ওজস্বিতা থাকতে হবে। মতানৈক্যের মাশুল দিতে দিতে ঐকমত্যের পায়ের তলায় মাটি সরে গেলে করার কিছু থাকবে না।
আমার ঘনিষ্ঠজন কবি আল মুজাহিদী, আবুল কাসেম ফজলুল হক, এম এইচ খান, মোস্তফা মনোয়ার আজ নেই। কিন্তু তারা রেখে গেছেন কীর্তি, রেখে গেছেন আমাদের সুবিবেচনার জন্য, দায়িত্ব দিয়ে গেছেন অনেক কিছু। সময়ের রিলে রেসে তাদের দিয়ে যাওয়া আলোকবর্তিকা আমাদের বইতে হবে, দিয়ে যেতে হবে পরেরজনদের হাতে। নিজেকে অমর ভেবে দু’হাতে সব কিছু ধরাবার পথ পন্থা ছাড়তে হবে। ঘোষণা এলো— এই বিস্তীর্ণ জমি থেকে যে যতটা দৌড়িয়ে আয়ত্তে আনতে পারবে, ততটা তার হবে, দৌড়ানো শেষ হয় না, আরো কিছুটা আরো কিছুটা করতে করতে দৌড়ানো শেষ হলো না, আগলানো গেল না যতটা দৌড়ানো জমি। মহাজন মনীষীরা বলেন, একজন মানুষের সাড়ে তিন হাতের বেশি জায়গার প্রয়োজন আছে কি, থাকে কি?
লেখক : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান