শিক্ষকরা সম্মিলিতভাবে চাইলে দেশের শিক্ষা চিত্রকে আরো আকর্ষণীয়, মানসম্মত ও নৈতিকতার ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব ছিল। দেশে শিক্ষার হার সন্তোষজনক, কিন্তু নীতিবাদী মানুষের সংখ্যা আশাব্যঞ্জক নয়। পরীক্ষার হলে দুর্নীতি, উত্তরপত্র মূল্যায়নে ভুলনীতি ও শিক্ষার মাধ্যমে দলীয় অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের রাজনীতি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাকে বারবার লাইনচ্যুত করেছে।
শতভাগ পাসের পেছনে রাষ্ট্র কর্তৃক ছাত্র-শিক্ষককে লেলিয়ে দেয়ার পরিণাম কত ভয়াবহ হতে পারে, তা জাতি এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। শিক্ষকদের বেতন আটকে যাওয়ার যন্ত্রণা এর বিপরীতে যেকোনো উপায়ে পাস করিয়ে দেয়ার নীতি শিক্ষাকে ধ্বংস করেছে।
চলছে এসএসসি পরীক্ষা। সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের মন্তব্যে এবার পরীক্ষার হলের পরিস্থিতি স্মরণকালের মধ্যে সুন্দর। প্রায় নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা হচ্ছে। বাংলা বিষয় দিয়ে পরীক্ষা শুরু হয়েছে এবং কমন-আনকমন মিলিয়ে পরীক্ষা সুন্দর হয়েছে। বাংলা ভাষায় গল্প মনের মাধুরী মিশিয়ে বানিয়ে লিখলেও হয়। তাতে নিরীক্ষণকারী নম্বর দেবেন কি দেবেন না, তা পরের ব্যাপার; কিন্তু পরীক্ষার্থী যা সৃষ্টি করবে তা কথাসাহিত্য! সাহিত্যের ইতিহাসে অদূর ভবিষ্যতে এর মূল্য অমূল্য হতে পারে, যদি পুড়ে না যায়। বাদাম ও চানাচুর বিক্রেতার হাতে ঠোঙা হিসেবে পৌঁছালেও অন্তত তার জীবিকা নিশ্চিত হয়ে যাবে।
সমস্যা বেধেছে ইংরেজি পরীক্ষার দিন। ইংরেজিতে বাঙালি বারবার আটকে যায়। শিক্ষার্থীদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়লেন কয়েকজন শিক্ষক! তারাই পরীক্ষার হলে উত্তর লিখে দিতে, কারেকশন করে দিতে কিংবা বই ছিঁড়ে দিতে শুরু করলেন।
কিন্তু শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর এই প্রয়াসে বাধা এলো সাংবাদিক ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে। তারা তো আর শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদরদি নন! শিক্ষার্থীদের সাথে আগে যোগাযোগ না থাকাতে, শ্রেণিকক্ষে দেখা না হওয়াতে সম্পর্ক জন্মেনি। বহিষ্কৃত হলো, জরিমানা দিতে হলো। অথচ যে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদেরকে অনৈতিক সুযোগ দিলেন, তারাই সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছে একসময় গালাগালির শিকার হবেন। কেন? পরে বলছি।
পাস না করলে প্রতিষ্ঠানের বেতন বন্ধ হয়ে যায়, শিক্ষার্থী অন্য স্কুলে চলে যায় কিংবা পাশাপাশি স্কুলের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা- তাতে পাসের হারের হ্রাসবৃদ্ধি সম্মান-অসম্মানের ব্যাপার। বিষ্ঠা কেন উপকারী- যুক্তি খুঁজলে এর পেছনেও বহু যুক্তি দেয়া যাবে। যুক্তি ও কুযুক্তির তফাত কতিপয় শিক্ষক রাখেন কি-না, সেটিও এখন সংশয়ের।
নয়তো, যিনি শিক্ষকের তকমা মেখেছেন, তার দ্বারা শিক্ষার্থীদের অনৈতিক সুবিধা দেয়া, নকলে সহায়তা করা, পরীক্ষার হলে প্রশ্ন বলে দেয়া- এসব খুবই লজ্জাজনক কাজ। সাংবাদিক ও প্রশাসনের কাজ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। অথচ তারা যখন শিক্ষকদের অসদুপায়ে সহায়তা চিত্র আবিষ্কার করেন, নকলের মচ্ছব জনগণের সামনে আনেন- সেই লজ্জায় অসৎ শিক্ষকদের আত্মসমালোচনায় লজ্জিত হয়ে সরে দাঁড়ানো উচিত।
শিক্ষক যখন অন্যায়ের সহায়ক হয়, তখন তার মতো ভণ্ড এবং জাতির জন্য বিপথগামী আর কেউ হয় না। এমন শিক্ষকদের শিক্ষকতা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাওয়া উচিত। সমাজে অনেক কাজের কাজি আছে, যেসব পেশায় শিক্ষকের তুলনায় বেশি যোগ্যতা লাগে না। সেসব কাজ করলে অর্থের ক্ষুধা মিটবে, মনের অসততাও বাস্তবায়ন করা যাবে।
বাই চয়েজ কিংবা বাই চান্স, যেভাবেই একজন শিক্ষকতায় আসুক না কেন- ক্লাসে, পরীক্ষার হলে কিংবা সমাজের সামনে দাঁড়ানোর আগে তার শুদ্ধ হয়ে যাওয়া উচিত। সমাজের অসঙ্গতি, দুর্নীতি এবং যাবতীয় কু-রীতির বিরুদ্ধে জীবনভর তার যুদ্ধ করা উচিত।
পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থী দেখাদেখি করার চেষ্টা করে- এটিতে ব্যক্তিগতভাবে আমি তাদের দোষ দেখি না। এই দেখাদেখি বন্ধ করার জন্য শিক্ষক সেখানে পাহারাদার হিসেবে নিযুক্ত হয়। উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা একজন শিক্ষকের তো কেবল নৈতিক দায় নয়; বরং যেহেতু এর জন্য সম্মানী আছে, সেহেতু এটি রিজিকের হালাল-হারামের সাথেও সরাসরি যুক্ত।
সম্মানিত শিক্ষকদের সততা-নৈতিকতা এবং দায়িত্বশীলতার ওপর নির্ভর করে এই সমাজের গন্তব্য। অসংখ্য ভালো শিক্ষক আছেন। মন্দের সংখ্যা সর্বত্রই সামান্য। তবে সমস্যা হচ্ছে, শিক্ষকদের গোটা সম্প্রদায় সাদা মোড়কে আবদ্ধ। এই পোশাকের কোথাও যখন সামান্য দাগ লাগে, তা দূরদূরান্ত থেকে দেখা যায়।
সারা বাংলাদেশের কয়েক হাজার পরীক্ষাকেন্দ্রের দু-চারটিতে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। শতাংশের বিচারে এসব সামান্য হলেও প্রভাবক হিসেবে মোটেও উপেক্ষা করার নয়। শিক্ষকদের সৎ হতেই হবে। জীবিকা বিভিন্নভাবে উপার্জন করা যায়। শিক্ষক হিসেবে সৎ, দায়িত্বশীল থাকতে না পারলে শিক্ষা পরিবার থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নেয়া উচিত।
সমাজ বিনির্মাণে, ত্রুটি সংশোধনে কিংবা ছিদ্রপথ দেখিয়ে দিতে যাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য, তারাই যদি অপতৎপরতায় জড়িয়ে যান, তবে সেই সমাজ-রাষ্ট্রব্যবস্থা দুঃখ দূর হবে না। শিক্ষিত প্রজন্মের চাইতে আমাদের নৈতিক শিক্ষিত প্রজন্ম বেশি দরকার। সবার সনদধারী হওয়ার দরকার নেই। কেউ কেউ নীতিবাদী কৃষক হোক, সৎ ব্যবসায়ী হোক। যারা পরিশ্রমী ও পড়ুয়া, তারা যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে শিক্ষার বৈতরণী পার হোক। শিক্ষক পরীক্ষার হলে উত্তর বলে দিচ্ছেন, লিখে দিচ্ছেন কিংবা উত্তরপত্রে প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি নম্বর দিচ্ছেন- এসব মানায় না, শিক্ষকদের সাথে একদম যায় না।
শিক্ষকদের থেকে কাম্য আচরণ পরিমাপের মানদণ্ড আছে। যদিও শিক্ষকদের সীমাবদ্ধতা বিস্তর, বঞ্চনার অভিযোগ ও স্বাভাবিক চাহিদা পূরণের উপায় ও অভাব ঊর্ধ্বমুখী- তবুও শিক্ষকতা মহান পেশা। এখানে প্রত্যেক পদক্ষেপ সামাজিক কাম্যতার দ্বারা মাপা হয়। প্রজন্মের ভবিষ্যৎ যারা গড়েন, তাদের মনে অনৈতিকতার কালিমা থাকলে সর্বনাশ।
শিক্ষা সংস্কারের জন্য একটি কমিশন দরকার। অথচ কোনো এক অজানা কারণেই সেটি যেন হলো না। সমাজকে শুধরে দিতে শিক্ষক ও শিক্ষকতাও শুধরে যাক। পাসের হার কম হলেও যাতে রাষ্ট্রের ভিত মজবুত হয় সেদিকে লক্ষ দিতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক