শাহেদ আলী টিটু
বেগম খালেদা জিয়াকে প্রথম দেখি ১৯৯১ সালের নির্বাচনী গণসংযোগকালে। তিনি চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপনির্বাচনে ওই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট মোড়সংলগ্ন ধনিয়ালাপাড়া এলাকায় গণসংযোগকালে এক পথসভায় ভাষণে বলেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই চট্টগ্রামে তিনি নিহত হন। তাই চট্টগ্রাম আমার শহর। এর উন্নয়নের দায়িত্ব আমার।
তিনি কথা রেখেছিলেন। ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়ে চট্টগ্রামে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছিলেন। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি কলেজ, নতুন রেলস্টেশন, শাহ আমানত সেতু, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, বিজিএমইএ ভবনের জন্য জমি বরাদ্দ, চট্টগ্রাম চেম্বারকে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের জমি বরাদ্দ এবং ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনসহ ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেছিলেন তিনি। কিন্তু বিগত সরকার তাকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটক রেখেছিল। তাকে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। আজ তার জীবন সঙ্কটাপন্ন। তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন। তিনি বিগত ১৫ বছরে অত্যাচার-নির্যাতন ও কারাবাসের পরও আপস করেননি। তাকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। মইনুল রোডের সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে। তবু তিনি স্বৈরাচারের সাথে আপস করেননি।
১৯৮৬ সালে প্রেসিডেন্ট এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যায়নি বিএনপি। অন্য দিকে শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে এক জনসভায় ঘোষণা দিয়েছিলেন এরশাদের অধীনে যারা নির্বাচনে যাবে, তারা জাতীয় বেঈমান। ওই বছর ২১ মার্চ রাতে হঠাৎ করে শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণায় এরশাদবিরোধী আন্দোলনরত দলগুলো হতবাক হয়ে পড়ে। কিন্তু বিএনপি এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা মানে স্বৈরশাসনকে বৈধতা দেয়া মনে করে এ নির্বাচন বর্জন করে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের দৃঢ়তার কারণে তিনি দেশের মানুষের কাছে দ্রুত আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি পান।
১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে নির্মমভাবে হত্যার পর বেগম খালেদা জিয়ার গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আবির্ভাব ঘটে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়া সততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার সময়ের অর্থনৈতিক সংস্কার, উৎপাদনের রাজনীতি এবং ১৯ দফা কর্মসূচি দেশকে একটি মজবুত অর্থনৈতিক ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একপর্যায়ে আবদুস সাত্তারকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। একদিকে দলীয় কোন্দল, অন্য দিকে বিএনপির অনেক নেতার এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগদান-এ দুই পরিস্থিতিতে বিএনপি তখন অনেকটা বিপর্যস্ত। দলকে সংগঠিত রাখার প্রয়োজনে তৎকালীন বিএনপির সিনিয়র কিছু নেতার পরামর্শে এবং অনুরোধে রাজনীতিতে আসেন খালেদা জিয়া। সেই সময় থেকে মূলত তিনি হয়ে উঠেন বিএনপির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার দৃঢ়তা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং প্রখর দৃষ্টিভঙ্গি দলকে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নেয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বেগম জিয়ার সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আপসহীন ভূমিকা দেশব্যাপী তাকে তুমুল জনপ্রিয় করে তোলে।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনকালে খালেদা জিয়াকে কয়েকবার আটকের পরও আন্দোলন থেকে সরে আসেননি বিএনপি চেয়ারপারসন। ফলে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। জীবনের প্রথম নির্বাচনে অংশ নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। তার রাজনৈতিক জীবনে যতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন কোনোটাতে পরাজিত হননি।
২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের মাধ্যমে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে। তখন জামায়াতকে নিয়ে সরকার গঠন করে। ২০১৮ সালের বিতর্কিত রাতের ভোটের নির্বাচনে বিএনপির ছয়জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দলটি অনেকটা ইউটার্ন করে আন্দোলনের গতিপথ ঘুরিয়ে দেয়। হরতাল, অবরোধের মতো নেতিবাচক রাজনীতির পরিবর্তে ভিন্নধর্মী শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির সংমিশ্রণে এক অভূতপূর্ব সাড়া জাগানো রাজনীতির সূচনা করে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হেঁটে, নদী সাঁতরিয়ে চিঁড়া-মুড়ি নিয়ে বিএনপির জনসভায় অংশ নিতে থাকেন।
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত সরকার ক্ষমতায় এসে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাসহ অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে। সেই সাথে দুর্নীতির মামলা দায়ের করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনার নামে করা মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। কিন্তু ঈর্ষান্বিত হয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নামে করা মামলাগুলো চলমান রাখে হাসিনা সরকার।
বেগম জিয়া বিরোধী দলগুলোর দাবির প্রেক্ষিতে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি মেনে নিয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের বিল পাস করে মাত্র ১২ দিনের মাথায় সংসদ ভেঙে দেন। তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে একই বছরের ১২ জুন ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১১৬টি আসনে জয়লাভ করে। বেগম খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে দলকে বিপুলভাবে বিজয়ী করে তিনি আবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে ২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেন।
২০১৪ সালে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যাপক সহিংসতার মধ্যে ভোটারবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারো ক্ষমতায় আসে। ১৫৩টি আসনে আওয়ামী লীগ বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলোর সাথে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশ^াস দেয়া হয় বিরোধী দলের নেতৃত্বকে। তার কথায় আস্থা রেখে বিরোধী দলগুলো ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু ওই নির্বাচনে এক অভিনব কারচুপির আশ্রয় নেয় আওয়ামী লীগ। ভোটের আগের রাতে অর্ধেক বাক্স ভর্তি করে রাখে। ফলশ্রুতিতে বিএনপিকে মাত্র ছয়টি আসনে বিজয়ী দেখিয়ে বাকি সব আসন আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলো ভাগবাটোয়ারা করে নেয়।
২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রতিটি আসনে নিজেদের মধ্য থেকে প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থী দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলে নিজ দলীয় লোকদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্ব›িদ্বতায় এক চরম গ্রুপিং ও বিভাজন তৈরি হয়। এতে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেখ হাসিনা যদি দূরদর্শী হতেন তাহলে বেগম খালেদা জিয়ার মতো বিরোধী দলগুলোর তত্ত¡াবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নির্বাচন দিতেন। সেই নির্বাচনে পরাজিত হলে বিরোধী দলে থাকতেন। তাহলে তাকে এভাবে অপমানিত হয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হতো না।
দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা না থাকলে রাজনীতিতে টিকে থাকা কঠিন। রাজনীতিতে বেগম জিয়ার এ অকুতোভয়, প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব জাতিকে পথ দেখাবে বহুকাল। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বস্তরের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাকে আজ যে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছেন এবং দেশবাসীর দোয়া ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন; তা এই উপমহাদেশে খুব কম রাজনৈতিক নেতার কপালে জোটে। জীবিত অবস্থায় মানুষের যে ভালোবাসা তিনি পেলেন এর চেয়ে বড় সফলতা একজন রাজনীতিবিদের জীবনে আর কী হতে পারে?
লেখক : গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও উপসচিব