কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য কিংবা সংস্কৃতিসহ নানা কারণে মানুষ ঢাকা, চট্টগ্রামে পাড়ি জমাচ্ছেন। কিছু মানুষ নিছক কর্মসংস্থানের জন্যই শুধু ঢাকায় আসছেন। অন্য দিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেও মানুষ প্রতিনিয়ত বাস্তচ্যুত হয়ে রাজধানীমুখী হয়েছেন। ফলে ঢাকা হয়ে উঠছে জনভারে ন্যুব্জ। বন্দরনগীর চট্টগ্রামেও একই প্রবণতা। সময়মতো সুযোগ-সুবিধা সারা দেশে ছড়িয়ে দিলে এমন পরিণতি হতো না।
গত শনিবার রাজধানীতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের সুষম নগরায়ন ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ : নীতি ও পরিকল্পনা প্রস্তাবনা’ শীর্ষক পরিকল্পনা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বলা হয়েছে, নগরায়নে সুষম বিনিয়োগ কম হচ্ছে বলে ঢাকার বাইরে টেকসই নগরায়ন হচ্ছে না। ঢাকা ও চট্টগ্রামে নগরায়ন কেন্দ্রীভূত হওয়ায় ঘনবসতি, যানজট, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঙ্কটের মধ্যেই মানুষ বসবাস করছে। সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় পরিবেশগত চাপ বেড়েছে। এর বিপরীতে খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর এবং উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকার কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য দেখা দিচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের নগরে মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ বাস করে। আগামী দুই দশক পর তা ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ষাটের দশকে বাংলাদেশে নগরায়নের হার ছিল ৫.১৪ শতাংশ, নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ১৯.৮ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। নগরায়নকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণসহ বিভিন্ন বিকল্প পন্থা প্রয়োগ করা যেতে পারে; কিন্তু এর কিছুই হয়নি।
ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামকেন্দ্রিক নগরায়নের এই চাপ সামনে বাড়বে। কিন্তু চাপ মোকাবেলায় সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। পদ্মা সেতু হওয়ার আগে বলা হয়েছিল- এই সেতুর ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। আর তাতে ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমবে। দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দরকার।
বহুদিন থেকেই লক্ষ করা যাচ্ছে, কোনো কোনো মহল ঢাকায় সব কিছুর কেন্দ্রীকরণ চান। এতে কারো কারো পোয়াবারো হলেও বেশির ভাগ মানুষ বঞ্চিত হয়। ঢাকার স্বল্প, নিম্ন আয় এবং বস্তির মানুষের জীবন করুণ। ঢাকা ও চট্টগ্রামমুখী মানুষের স্র্রোত কমানোর জন্য জেলাকেন্দ্রিক উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। জেলাগুলোর নির্দিষ্ট স্থানে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলে সেখানে মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকেও বাইরে নিয়ে যেতে হবে। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার জন্য যেন মানুষকে রাজধানী আসতে না হয়। নিজ জেলাতেই প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করা গেলে মানুষ বড় শহরমুখী হবে না।
সুষম নগরায়ন ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়। এ জন্য রাজনৈতিক উদ্যোগ জরুরি। বর্তমান অন্তর্বর্র্তী সরকারকে নগরায়ন ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। হয়তো বা আর সুযোগও নেই। কিন্তু সামনে নির্বাচনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাদেরকে এ কাজে মনোযোগী হতে হবে। নগরায়ন ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতিহারে থাকা দরকার। যার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ তাদের নিজ নিজ উন্নয়নের হিস্যা বুঝে পাবে।