বৈশ্বিক স্বাধীনতা সূচকে সবচেয়ে বেশি উন্নতি লাভ করা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ স্থান করে নিয়েছে। বুধবার প্রকাশিত ওয়াশিংটন-ভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউজের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৬০টি দেশের রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার অবনতি ঘটেছে এবং মাত্র ৩৪টি দেশে উন্নতি হয়েছে। ফ্রিডম হাউজের সূচকে ২০২৩ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৪০। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ৪৫। এক বছরে পাঁচ পয়েন্টের চেয়ে বেশি উন্নতি লাভ করেনি আর কোনো দেশ। তবে সমান উন্নতি লাভ করেছে ভুটান।
গত সাড়ে ১৫ বছরে বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে শেখ হাসিনার হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছিল। মানুষের রাজনৈতিক অধিকার তো ছিলই না, সাধারণ নাগরিক অধিকারও কেড়ে নিয়েছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ হয়েছিল দানবীয় দল। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ আওয়ামী লীগের স্বৈরশাসন মন থেকে মেনে নেয়নি। সুযোগের অপেক্ষায় থেকেছে স্বৈরশাসনের অবসানের। ৫ আগস্ট জনগণ সফল হয়েছে, হাসিনা পালিয়ে গেছে।
ফ্রিডম হাউজের প্রতিবেদনে যথার্থই বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে পরিবর্তন নির্বাচনের কারণে আসেনি, এসেছে গণবিক্ষোভের ফলে।’ বাংলাদেশে স্বৈরশাসনের অবসান ও স্বাধীনতা সূচকের উন্নতির অংশীদার দেশের ছাত্র-জনতা। এই উন্নতি লাভ সম্ভব হয়েছে প্রায় দুই হাজার ছাত্র-জনতার প্রাণ বিসর্জন ও অসংখ্য মানুষের আহত হওয়ার মাধ্যমে।
ফ্রিডম হাউজের সূচকে সব দেশকে তিনটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেগুলো হলো স্বাধীন, আংশিক স্বাধীন, পরাধীন। রাজনৈতিক অধিকার চর্চা ও নাগরিক স্বাধীনতার চর্চায় বাংলাদেশকে ‘আংশিক স্বাধীন’ দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে।
গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে; কিন্তু যুগের পর যুগ দেশের মানুষ স্বাধীনতার সুফল পরিপূর্ণভাবে ভোগ করতে পারেনি। মানুষকে নানাভাবে বিভক্ত করে রাখা হয়েছে। আদতে এসবের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে তোলার অপচেষ্টা করা হয়েছে। ৫ আগস্টের মধ্য দিয়ে যে ঐক্যবদ্ধ জাতির প্রকাশ ঘটেছে আগামী দিনে তা কাজে লাগাতে হবে।
আমরা অতীতে দেখেছি, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজেদের সুবিধামতো নানা বিষয়ে সংযোজন-বিয়োজন, পরিবর্তন ও পরিমার্জন করেছে; কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেগুলো আবার নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে এটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন যে, সংস্কারগুলো একক কোনো দলের পক্ষে নয়; বরং দেশের সব মানুষের জন্য প্রয়োজন। একই সাথে এই রাষ্ট্রের শাসকরা যেন আগামীতে কোনোভাবেই শেখ হাসিনার মতো স্বৈরশাসক হয়ে উঠতে না পারে সে বিষয়গুলো অবশ্যই বর্তমান সরকারকে সংস্কারের সময় খেয়াল রাখতে হবে।
ফ্রিডম হাউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘শেখ হাসিনার দেড় দশকের তীব্র দমন-নিপীড়নের পর হঠাৎ করেই শুরু হওয়া রাজনৈতিক সংস্কার বেশ কঠিন কাজ হবে।’ সন্দেহ নেই সরকারের সংস্কার কাজ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে; কিন্তু যে সংস্কার দেশকে আগামী দিনে ফ্যাসিবাদী শাসনমুক্ত করে রাখবে সেই সংস্কার কাজে মানুষের সমর্থন অকুণ্ঠ থাকবে এবং বর্তমান সরকারও তা সফল করতে সক্ষম হবে। আর এসবের মধ্য দিয়েই দেশের মানুষ আগামী দিনে সত্যিকার অর্থেই স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারবে।