বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়নের কাঠামোতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী দাতা দেশগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ, সহায়তা বাজেট হ্রাস এবং ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে উন্নয়ন অর্থায়নের প্রাপ্যতা ও সাশ্রয়ী সুবিধা সংকুচিত হচ্ছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন, নমনীয় শর্তের ঋণ, ঋণের স্থায়িত্ব এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থায়নের ক্ষেত্রে নতুন এবং গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ২০২৩-২০২৭ সালের মধ্যে ডিএসি সদস্য দেশগুলোর বহুপাক্ষিক অনুদান ২৩ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। আর প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, এই প্রতিবেদনটিকে কেবল সহায়তা হ্রাসের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং আগামী দশকগুলোতে উন্নয়নের অর্থায়ন কিভাবে করা হবে, তা নতুন করে ভাবার আহ্বান হিসেবে নিতে হবে।

বুধবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)-এর যৌথ উদ্যোগে ‘ওইসিডি মাল্টিল্যাটারাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স ২০২৬ রিপোর্ট (এমডিএফআর): দক্ষিণ এশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় দক্ষিণ এশিয়া ও ওইসিডি-র বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ, পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজারের উন্নয়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থায়নের বৈচিত্রময় কৌশল অনুসরণ করছে। তিনি বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোকে তাদের ‘নৈতিক অবস্থান’ পুনরুদ্ধার করে জলবায়ু, খাদ্য ও জ্বালানি সঙ্কটের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর বাস্তব পরিস্থিতির প্রতি সাড়া দেয়ার আহ্বান জানান।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবস্থা এখন একটি ‘ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে’ দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অর্থায়নে উপকৃত হলেও এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে থাকা দেশটির জন্য এই বৈশ্বিক অর্থায়ন হ্রাস নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক বিষয়ক অনুবিভাগের মহাপরিচালক শাহ আসিফ রহমান বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন, জলবায়ু অর্থায়ন এবং এলডিসি উত্তরণের অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর উন্নত দেশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আরো জোরালো প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।

ওইসিডির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ অঁরি-বার্নার্ড সোলিগনাক-লেকমেট বলেন, বর্তমান সময়ের মূল প্রশ্ন হলো, আমরা কি বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে ও নতুন করে প্রাণবন্ত করতে পারব? তবে ‘সাহসী ও সুপরিকল্পিত সংস্কারের’ মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে এখনো রক্ষা করা সম্ভব।

প্রতিবেদনের সহ-লেখক লিওনার্দো আলতিয়েরি ও মারিয়াস গুয়েরিন জানান, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন ব্যবস্থা এখন সম্পদের ঘাটতিযুক্ত একটি ভিন্ন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। ২০২৪ সালে মূল ও নির্দিষ্ট খাতের অনুদান হ্রাসের ফলে মোট অনুদান প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। ২০২৩-২০২৭ সালের মধ্যে ডিএসি সদস্য দেশগুলোর বহুপাক্ষিক অনুদান ২৩ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তারা সতর্ক করেন, আর্থিক সীমাবদ্ধতার সময়ে প্রায়শই দরিদ্র দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় নমনীয় শর্তযুক্ত সম্পদ (কনসেশনাল রিসোর্সেস) সবার আগে কমিয়ে ফেলা হয়। আর ওইসিডির অর্থনীতিবিদ আবদুলায়ে ফাব্রেগাস বলেন, অনিশ্চয়তা এবং সহজ শর্তের সম্পদের জন্য ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা বর্তমান প্রেক্ষাপটকে প্রভাবিত করছে।

ওইসিডির আরেক সহ-লেখক মারিয়ুস গেরিন বলেন, ২০২৪ সালে বহুপাক্ষিক অর্থায়নের বহিঃপ্রবাহ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছালেও এর আড়ালে চাপের প্রাথমিক লক্ষণ স্পষ্ট। বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য স্বল্পসুদে অর্থায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও আর্থিক সঙ্কটের সময় সেগুলোই সবার আগে কমিয়ে দেয়া হয়।

পাকিস্তানের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের (এসডিপিআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আবিদ কাইয়ুম সুলেরি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচিত বহুপাক্ষিক অর্থায়নের সুশাসন নিশ্চিত করতে ‘একক কণ্ঠে’ কথা বলা। অন্যদিকে, সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের (এসপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ আসিফ ইকবাল বলেন, উন্নয়ন অর্থায়ন এখন ‘ভূ-রাজনীতির হাতিয়ার’ হয়ে উঠছে। সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে কেবল মাথাপিছু আয়কে বিবেচনা না করে জলবায়ু ঝুঁকি ও বহুমাত্রিক দারিদ্র্যকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

নেপালের ‘সাউথ এশিয়া ওয়াচ অন ট্রেড, ইকোনমিকস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ (সাওতি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. পারস খরেল বলেন, এলডিসি থেকে টেকসই উত্তরণের জন্য অব্যাহত সহায়তা অপরিহার্য, কারণ যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি অর্জিত সাফল্যকে নস্যাৎ করে দিতে পারে।

শ্রীলঙ্কার ‘দ্য সেন্টার ফর পভার্টি অ্যানালাইসিস’ (সেপা)-এর দলনেতা ড. রোশন অ্যান পেরেরা বহুপাক্ষিক অর্থায়নকে একটি ‘স্থিতিশীল নোঙর’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুবিধা অকালে হারিয়ে গেলে দেশগুলো ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক ঋণের ফাঁদে পড়তে পারে।

সাউদার্ন ভয়েস সংস্থাটির গবেষণা ও উদ্ভাবন বিভাগের প্রধান ড. প্রত্যুষ শর্মা ‘রিভার্স লিভারেজ ইফেক্ট’ বা বিপরীত প্রভাবের কথা উল্লেখ করে সতর্ক করেন যে, মূল তহবিলে কাটছাঁট মাঠপর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই উন্নয়নের প্রকৃত চাহিদা বোঝার জন্য ‘জিডিপি-ভিত্তিক পরিমাপের বাইরে’ গিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা একমত হন যে, পরিবর্তিত এই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়ন কাঠামোর সংস্কার প্রক্রিয়ায় আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। একইসাথে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ জোরদার করতে হবে এবং সাশ্রয়ী ও পূর্বাভাসযোগ্য অর্থায়ন প্রাপ্তির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।