জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। একপর্যায়ে অনুষ্ঠানস্থল থেকে কূটনীতিকরা বেরিয়ে যান। অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত একটি তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারিতে জুলাইয়ের ধারাবাহিকতা সঠিকভাবে তুলে না ধরার অভিযোগে এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।

‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাইযোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ শিরোনামে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গত বুধবারের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজউদ্দিন আহমেদ। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ক্ষোভ প্রকাশ করে অনুষ্ঠানে বলেন, ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের মর্যাদা নিশ্চিত করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। এই তথ্যচিত্রে শহীদ আবু সাঈদের ছবি ছিল না। ছিল না বেগম খালেদা জিয়ার ছবিও। তাদের ছবি ছাড়া ওই আন্দোলনের কোনো তথ্যচিত্র পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো ঐতিহাসিক মুহূর্ত আমাদের জাতীয় জীবনে শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষার একটি উৎস। সেই ইতিহাস যখন রাষ্ট্র নিজে নথিবদ্ধ করে, তখন তার দায়িত্ব আরো বেশি। সরকারি বয়ান পাঠ্যপুস্তক, গবেষণা এবং জনস্মৃতির ভিত্তি হয়ে ওঠে। এ কারণে তথ্যের নির্ভুলতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মতভেদের প্রতি সর্বোচ্চ সতর্ক হতে হয়। সরকারের তৈরি ডকুমেন্টারি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। আন্দোলনের আইকন আবু সাঈদের ছবি বা অবদান যে তথ্যচিত্রে স্থান পায় না, তা নিঃসন্দেহে বড় একটি বিচ্যুতি। সরকার পতনের এক দফা ঘোষণার সময় ও প্রেক্ষাপট নিয়েও ডকুমেন্টারিতে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগ এসেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা হলো- রাষ্ট্র যখন কোনো আন্দোলন বা ঐতিহাসিক ঘটনা একক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করতে চায়, তখন দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজে বিভাজন বাড়ায়। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রাষ্ট্রীয় বয়ানে কিছু ব্যক্তি ও রাজনৈতিক শক্তিকে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আবার অন্যদের অবদান আড়াল করা হয়েছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের মতো সর্বজনীন জাতীয় ইতিহাসও রাজনৈতিক বিতর্কে পড়েছে। জুলাই নিয়েও যদি একই প্রবণতা দেখা দেয়, তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। ঐতিহাসিক ঘটনায় কারো অবদান খাটো করে দেখানো বা কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেয়া ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে না; ভবিষ্যতের জন্য নতুন বিতর্কের বীজ বপন করে।

ইতিহাসের বড় শক্তি বিশ্বাসযোগ্যতা। সেই বিশ্বাসযোগ্যতা আসে তথ্যের সত্যতা থেকে। সরকার যদি নিজে এমন একটি বয়ান তৈরি করে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা ব্যক্তির উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে মানুষ বিকল্প বয়ান খুঁজতে শুরু করে। তখন সরকারি দলিলের প্রতি আর আস্থা থাকে না। ইতিহাস রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অস্ত্রে পরিণত হয়।

আজ যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তাদের মনে রাখা উচিত- ক্ষমতা পরিবর্তনশীল। এখন যে বয়ান সরকার প্রতিষ্ঠা করবে, আগামী দিনে অন্য সরকার তা বদলে দিতে পারে। এভাবে ইতিহাস যদি সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টাতে থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতির সামষ্টিক স্মৃতি। জাতীয় ইতিহাসকে দলীয় ইতিহাসে রূপান্তরের চেষ্টা স্থায়ী সফলতা আনে না।