আমাদের সমাজ বাস্তবতায় এখনো নারীর প্রতি সহিংসতা এক ভয়াবহ মানবাধিকার সঙ্কট হিসেবে রয়ে গেছে। বস্তুত এ দেশে দাম্পত্য জীবনে অর্থাৎ পারিবারিক পরিমণ্ডলে বেশির ভাগ পুরুষ তাদের স্ত্রীদের প্রাপ্য সম্মান না দেয়ায় নারীর প্রতি সহিংসতার তীব্রতা বাড়ছে। এক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব প্রকটভাবে বিদ্যমান রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪-এ উঠে এসেছে এক গভীর উদ্বেগজনক চিত্র। এতে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ বিবাহিত নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে স্বামী বা ঘনিষ্ঠজনদের দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো- ৬৪ শতাংশ নারী তাদের অভিজ্ঞতা কাউকে জানাননি। ভয়, সামাজিক কলঙ্ক ও লজ্জাবোধে তারা নীরব থেকেছেন। অন্যদিকে সহিংসতার পর চিকিৎসা ও আইনি পদক্ষেপ নিতে গিয়ে ভুক্তভোগী নারী বা তাদের পরিবারকে অর্থনৈতিক চাপে পড়তে হচ্ছে, যা দারিদ্র্যের চক্র আরো গভীর করছে।
বিবিএসের গবেষণা অনুযায়ী, ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী স্বামীর নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের, ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ শারীরিক, ২৯ শতাংশ যৌন এবং ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এমনকি গত ১২ মাসে ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ নারী কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। উদ্বেগজনক বিষয় হলো- এ সহিংসতা একবার নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে ঘটে। গর্ভাবস্থায়ও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেশি; ৭ দশমিক ২ শতাংশ নারী শারীরিক ও ৫ দশমিক ৩ শতাংশ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন এ সময়ে। লক্ষণীয়, ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরী তুলনামূলকভাবে বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছে। শহরের বস্তি এলাকা, উপকূল ও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে বসবাসরত নারীরা আরো বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছেন বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বামীর বাইরেও ১৫ শতাংশ নারী শারীরিক এবং ২ দশমিক ২ শতাংশ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১৫ বছর বয়সের পর থেকে। শহরাঞ্চলে বিশেষ করে সিটি করপোরেশন এলাকায় এমন প্রবণতা বেশি। নারীর প্রতি সহিংসতায় নতুন প্রবণতা হিসেবে দেখা দিয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার। ৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী জীবনে কখনো না কখনো প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যার হার তরুণী ও শহুরে নারীদের মধ্যে বেশি।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেনমোহর বা যৌতুকের চাপ, স্বামীর মাদকাসক্তি বা পরকীয়া এবং স্বামীর প্রতি ভয়ের অনুভূতি সহিংসতার আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার এই জরিপ বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা উন্মোচন করেছে। এ প্রতিবেদন শুধু সংখ্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সতর্কবার্তা, যা আমাদের অবগত করে যে- নারীর প্রতি সহিংসতা সামাজিক কাঠামো, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে প্রোথিত।
অবস্থার উন্নয়নে নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য, আইনি ও সেবা সম্প্রসারণ; আশ্রয়কেন্দ্র ও অর্থনৈতিক সহায়তা সহজলভ্য করা ও প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা মোকাবেলায় শক্তিশালী আইন ও সাইবার আদালত গঠন করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
আমরা মনে করি, এই ভয়াবহ অপসংস্কৃতি থেকে উত্তরণে পুরুষদের ইতিবাচক মানসিকতা তৈরিতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি সহিংসতাবিরোধী পারিবারিক শিক্ষা চালু করা দরকার।