দেশের অর্থনীতিতে ধীরে হলেও গতি আসছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বাড়বে বলে আভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি। সংস্থাটি বলছে, এবার বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫ শতাংশ হতে পারে। আগে বলেছিল, প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ১ শতাংশ হবে। সংস্থার সর্বশেষ প্রাক্কলন আগের চেয়ে সামান্য কম হলেও তা হবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চেয়ে বেশি। শুধু তাই নয়, বলা হয়েছে- বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার দক্ষিণ এশীয় সব প্রতিবেশী দেশের তুলনায় ভালো। এর কারণ, গত ১৫ বছরের নৈরাজ্যকর শাসনে যে নির্বিচার লুটপাট হয়েছে তা বন্ধ করা এবং অর্থনৈতিক সংস্কার।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করার শেখ হাসিনার দু’টি রীতি অপসারণে কাজ করছে অন্তর্বর্তী সরকার। হাসিনা সরকার বিদেশী ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করে এবং বাংলাদেশ থেকে বিদেশী মুদ্রা স্থানান্তর করে। স্থানান্তর বলতে যে হাসিনা ও তার দোসরদের নির্বিচার লুটপাট ও পাচারের কথা বলা হচ্ছে, তা স্পষ্ট।
সময়মতো বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ও লুটপাট এবং পাচার বন্ধ করা শুধু নয়; অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কারও সম্পন্ন করছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যাংক খাতের উন্নয়নে সচেষ্ট হয়েছে। দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ ও তারল্যের জোগান দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। এতে যে কিছুটা সফলতা এসেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তবে অর্থনীতিতে এ মুহূর্তে অনেক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জও আছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পাল্টা শুল্কের বিরূপ প্রভাব আছে। সম্ভাব্য ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা রফতানি প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে। এডিবির রিপোর্টে বলা হয়েছে- আগামী নির্বাচনের ব্যয়, চলমান মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা ইত্যাদি বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে চাপ বাড়াতে পারে।
আমাদের বিবেচনায়, এগুলো মূল সমস্যা নয়। সরকার কতটা সক্ষমতার সাথে বাইরের শক্তির বৈরিতা মোকাবেলা করতে পারছে, তাই দেখার বিষয়। বিশ্বের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শ প্রভাবশালী শক্তির ইশারায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি আচরণ করে। যেমন- আইএমএফ ২০২৩ সালে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারকে ঋণ দিয়ে বিপদমুক্ত করেছে; কিন্তু ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারকে বাড়তি ঋণ দেয়নি। এর পেছনে বাইরের ইশারা থাকতে পারে।
এডিবির প্রতিবেদন বলছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আর্থিক খাতে চলমান সংস্কারের কারণে স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়তে পারে। সংস্থাটির রিপোর্টে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি ইতিবাচক তথ্য হলো- আগামী বছর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বেশি হবে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্ক নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রফতানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে দেখার বিষয়, এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক বড় সাফল্য আছে। তারা আলোচনার মাধ্যমে শুল্কের হার ভারত বা চীনের ওপর আরোপিত শুল্কের চেয়ে অনেকটা কমাতে পেরেছে। বাংলাদেশী রফতানিকারকরা সেই সুবিধা পাবেন।
গত ১৫ বছরের নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার রাজনীতি ফিরে আসার সুযোগ রোধ করে রাজনৈতিক স্থিতি নিশ্চিত করতে পারার ওপর মূলত বাংলাদেশের অর্থনীতির সুষ্ঠু বিকাশ নির্ভর করে।