দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ১৯৪৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইঙ্গ-মার্কিন ষড়যন্ত্রে ইসরাইল রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন। সেই থেকে ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যবিপর্যয় শুরু। এ পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটেনি; বরং দিন দিন আরো অবনতি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলি আগ্রাসনে ফিলিস্তিনিরা বিপর্যয়ের শেষসীমায় গিয়ে পৌঁছেছেন। বিশেষ করে গাজাবাসী। গাজার অধিবাসীরা এখন বাঁচা-মরার সন্ধিক্ষণে। এ উপত্যকায় ইসরাইল ২২ মাস ধরে আগ্রাসন চালানোয় এখানকার অধিবাসীরা আজ বিপন্ন। কিন্তু ইসরাইলের এ মানবতাবিরোধী অপকর্মের জোরালো প্রতিবাদ এবং এ থেকে তেলআবিবকে বিরত রাখতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেননি বা নেননি বিশ্বনেতারা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র। উল্টো ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলকে বিপুল সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ ওয়াশিংটন ও পশ্চিমারা কথায় কথায় মানবতার সবক দেন।
সরকারি হিসাবে, অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা ইসরাইলি আগ্রাসনে নিহতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ৬১ হাজার ১৫৮ জন। অনাহারে মারা গেছেন আরো ১৯৩ জন। অসমর্থিত হিসাব- ইসরাইলের বেপরোয়া হামলায় গাজায় লাখের কাছাকাছি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অন্য দিকে ২২ লাখ অধ্যুষিত গাজার প্রায় সবাই এখন বাস্তুচ্যুত। ইসরাইলি হামলায় যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। গাজায় চলমান দুর্ভিক্ষের মধ্যে ইসরাইলের অনুমতিতে বিভিন্ন দেশ আকাশপথে ত্রাণ পাঠাচ্ছে। আকাশ থেকে ফেলা ত্রাণের বাক্স কখনো কখনো সাধারণ মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
এমন বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে গাজা শহর দখলের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এ তথ্য জানিয়েছে। গাজা দখলের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গাজা পুরোপুরি দখল করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত ইসরাইলের। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর গাজা দখলের পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে না বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। রয়টার্সের খবর, তেলআবিবের সম্ভাব্য এ পরিকল্পনা এবং সেখানে হামলা বাড়ানো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসঙ্ঘ। গত মঙ্গলবার জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরেন সংস্থাটির সহকারী মহাসচিব মিরোস্লাভ জেনকা।
গাজা দখলের ইসরাইলি পরিকল্পনার বিষয়টি যদি সত্য হয়, তাহলে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে, এটি সহজেই অনুমেয়। এই অভিযানের সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন; বরং ইসরাইলকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে গাজাকে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমানে গাজার প্রায় ৮৬ শতাংশ এলাকা সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাকি অংশে অভিযান চালালে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে-এটি নিশ্চিত।
আমরা মনে করি, বিশ্বনেতাদের ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার নিয়ে যদি ন্যূনতম দায়বোধ থাকে; তাহলে ইসরাইলি আগ্রাসন রুখতে দ্রুততম সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্য দিকে আরব দেশগুলোও ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য এড়িয়ে যেতে পারে না। যদি এড়িয়ে যায় তা হলে তাদের একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। সঙ্গত কারণে, আরব দেশগুলোর উচিত, ইসরাইলের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টিতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো।