আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে দেশের এক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে। দীর্ঘদিনের নৈরাজ্যের অবসান ঘটেছে। সব কিছু সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ ধারায় ফেরার আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনও সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে বলে জনগণ আশা করছেন। কারণ, বিশ্বাসযোগ্য ও সফল নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ গতি-প্রকৃতি। কিন্তু এ জন্য যে প্রস্তুতি দরকার তা এখনো দৃশ্যমান নয়। রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা আছে। এমনকি নির্বাচন নিয়েও অনেকের মনে সংশয় রয়েছে।

নির্বাচন হলে তা কতটা স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হবে সে বিষয়ে প্রশ্ন আছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, বিশ্বাসযোগ্য সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে আমাদের ধারণা, সফল নির্বাচন করা ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কারণ, বর্তমান নির্বাচন কমিশন জনগণের আস্থা কতটা অর্জন করতে পেরেছে তা অস্পষ্ট। একটিও নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা নেই। ১৫ বছরে ফ্যাসিবাদী শাসকের নির্বিচার দলীয়করণের ধারায় গঠিত জনপ্রশাসন সর্বত্র অটুট। নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ অপ্রস্তুত ও অগোছালো। এমনই এক পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে ইসি। রাজনৈতিক দলসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনগণের সাথে সংলাপ করছে। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু তাদের নেয়া প্রতিটি পদক্ষেপ যথাযথ মান রক্ষা করছে কি না তা নিয়ে এর মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।

ইসির প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্বাচন পর্যবেক্ষক নিয়োগ। গত শনিবার দেশের ৭৩টি বেসরকারি সংস্থাকে পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে প্রাথমিকভাবে নিবন্ধনযোগ্য বলে বাছাই করে ইসি। একটি জাতীয় দৈনিকে সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাছাই করা অনেক সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণের যোগ্যতা রাখে না। অনেক সংস্থা নিবন্ধনের যোগ্যতাও পূরণ করে না। এমনকি অস্তিত্বহীন, দুর্নীতি ও পতিত সরকারের সুবিধাভোগী সংস্থা বা সংগঠনও মনোনীত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা মহানগরী ও জেলা থেকে মনোনীত কয়েকটি সংস্থা অস্তিত্বহীন। ঢাকার বাইরে থেকে মনোনীত হয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানও যার ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যায় চায়ের দোকান, মুদির দোকান। বেশ কয়েকটি সংস্থার অফিস তালাবদ্ধ।

শুধু অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান বাছাই করা হয়েছে তাই নয়; রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আছে এমন প্রতিষ্ঠানও আছে তালিকায়। আছে বর্তমানে প্রতিদ্ব›দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীর প্রতিষ্ঠান, এমনকি ফ্যাসিবাদী সংগঠন আওয়ামী লীগের এমপির প্রতিষ্ঠানও। আওয়ামী নেতা বা মন্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানও তালিকায় এসেছে। এটি ইসির শর্তের খেলাপ।

আওয়ামী নৈরাজ্যের শাসনকালে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হওয়ার একমাত্র যোগ্যতা ছিল, দলীয় আনুগত্য। অর্থাৎ- যে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন সুষ্ঠু ও সর্বাঙ্গ সুন্দর হয়েছে বলে প্রতিবেদন দেবে; সেই প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষক হবে। শেখ হাসিনার তিনটি জাতীয় নির্বাচনে দেশী-বিদেশী সব পর্যবেক্ষক ছিল ওই শর্তে নিয়োজিত। তারা তাদের দায় ঠিক মতো মিটিয়েছে। বর্তমান ইসিকে সেই প্রবণতা থেকে পরিপূর্ণভাবে মুক্ত থাকতে হবে। শুধু পর্যবেক্ষক নিয়োগ নয়, প্রতিটি কাজ করতে হবে সতর্কতার সাথে খোঁজখবর নিয়ে।

দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার অভাব ঘটলে ইসির পক্ষে নির্বাচনের বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা শুধু দুরূহ নয়, অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।