দূরপাল্লার সড়কে চলাচল করা ‘ডাবল ডেকার স্লিপার বাস’ এখন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বাস বাইরে থেকে ঝকঝকে দেখায়। আরামদায়কও মনে হয়। বাস্তবে এগুলোর ভেতরের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। চলাচলে থাকে ঝুঁকি এবং এর আইনগত ভিত্তিও নেই।
সম্প্রতি উচ্চ আদালতে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্র্ট অথরিটির (বিআরটিএ) দাখিল করা তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে— দেশের সড়ক-মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়ানো ৮২৯টি স্লিপার বাসের একটিরও বিআরটিএ’র অনুমোদন নেই। আইনগত বৈধতা ছাড়া বাসগুলো কিভাবে দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়কে যাত্রী পরিবহন করছে, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাত্রীনিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে যেসব স্লিপার বাস চলাচল করে, সেগুলো মূলত একতলার (সিঙ্গেল ডেক) চেসিস আমদানি করে স্থানীয় গ্যারেজে বেআইনিভাবে বডি মডিফাইয়ের মাধ্যমে দোতলা করা হয়। কাঠামোগত এই পরিবর্তনে চেসিস, সাসপেনশন ও ব্রেক ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, যা বাসটির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশের কোনো সড়ক থ্রি স্টারের উপরে নয়। জাতিসঙ্ঘের সড়ক মূল্যায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে একটি সড়কের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা বিবেচনা করে ওয়ান থেকে ফাইভ স্টারের মধ্যে রেটিং দেয়া হয়। ওয়ান স্টার রেটিংয়ের সড়ককে ধরা হয় সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে সামান্য ভুলে বড় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটে। থ্রি স্টার হলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরাপত্তার সর্বনিম্ন মানদণ্ড। সে অনুযায়ী, ডাবল ডেকার বা উঁচু স্লিপার বাস নিরাপদে চলাচলে অন্তত ফোর স্টার থেকে ফাইভ স্টার মানের সড়ক প্রয়োজন। সাধারণগুলোর চেয়ে স্লিপার বাস উঁচু হওয়ায় থ্রি স্টার সড়কে বাঁক নেয়ার সময় বা হঠাৎ লেন পরিবর্তন করতে গেলে এগুলো উল্টে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। ফোর বা ফাইভ স্টার সড়কে বাঁকগুলো এমন ডিজাইনে করা হয়, যেন গাড়ি ভারসাম্য না হারায়। ওই সব সড়কে এক্সপ্রেসওয়ে বা নিয়ন্ত্রিত লেন থাকে, যেখানে মন্থরগতির যানবাহন উঠতে পারে না। ডাবল ডেকার বাস চলাচলে রাস্তার প্রশস্ততা বেশি হওয়া এবং মাঝখানে কনক্রিটের ডিভাইডার থাকা বাধ্যতামূলক; কিন্তু এসব বিবেচনায় না নিয়ে আমাদের সড়কগুলোতে স্লিপার বাস চলাচল করছে। এতে সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ’র ভূমিকা নিয়ে। আদালতের কাছে সংস্থাটির দাবি, তারা স্লিপার বাসের কোনো অনুমোদন দেয়নি। একই সাথে সংস্থাটির প্রধান এসব যান চলাচলের খবরই জানতেন না! প্রশ্ন ওঠে— একটি বাসের রুট পারমিট, ফিটনেস সনদ এবং নিয়মিত চেকিং ছাড়া কিভাবে বিপুলসংখ্যক বাস বছরের পর বছর রাজধানীর গাবতলী, আমিনবাজার ও যাত্রাবাড়ীর প্রকাশ্য গ্যারেজে রূপান্তর হয়ে রাস্তায় নামল? বাসমালিক সমিতির দাবি, আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিআরটিএ’র কিছু কর্মকর্তা অনুমোদন ছাড়া গাড়ি চলাচলের সুযোগ করে দিয়েছেন। এই দাবি সত্য হলে নিশ্চয় এর দায় বিআরটিএ’র ওপর বর্তায়। হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন, বিআরটিএ’র অনুমোদন ছাড়া কোনো অবৈধ স্লিপার বাস মহাসড়কে চলতে পারবে না।
আমরা আশা করি, সড়ক পরিবহন আইন ও বিধিমালার সঠিক প্রয়োগ করা হবে। পাশাপাশি স্লিপার বাসের কারিগরি মান ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিরূপণ করতে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। যেসব কর্মকর্তা বেআইনিভাবে এসব গাড়ি চলাচলে মদদ দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।