গ্রামের মানুষের জন্য ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ নামে একটি নতুন প্রকল্প নিয়েছে সরকার। ঐতিহ্যবাহী দেশীয় পণ্যের দেশী-বিদেশী বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাদের অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসা এই প্রকল্পের লক্ষ্য। পৌনে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির মাধ্যমে দেশের ৫৬টি গ্রামে ২৮০ জন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

দেশের মোট জনসংখ্যার ৬১ দশমিক ৮২ শতাংশ পল্লী এলাকার বাসিন্দা। তাদের জীবনমানের উন্নয়ন সামগ্রিক পল্লী উন্নয়নের মূল প্রতিপাদ্য। নতুন প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি পল্লীর সম্ভাবনাময় পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোর উৎপাদন, মানোন্নয়ন, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। প্রকল্পের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ১৭ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে।

গ্রামীণ এলাকায় উন্নয়ন ও সেবা দেয়ার বর্তমান ব্যবস্থা অনেকটা বিক্ষিপ্ত। বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগের মধ্যে যথেষ্ট সমন্বয় নেই। ফলে গ্রামের মানুষের কাক্সিক্ষত আর্থসামাজিক পরিবর্তন হচ্ছে না। এর সাথে আছে প্রাচীন উৎপাদনপদ্ধতি, প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, মূলধনের অভাব ও অপরিকল্পিত ব্যবহার, পণ্যের বহুমুখীকরণের সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বল বিপণনব্যবস্থা। ফলে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না উৎপাদনকারী। তাই উৎপাদন, মূল্য সংযোজন ও বিপণনের পুরো প্রক্রিয়া জোরদার করা এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

প্রকল্পটি আশাব্যঞ্জক। গ্রামীণ কুটিরশিল্পের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পণ্য আমাদের অহঙ্কার; কিন্তু যথাযথ সুরক্ষা দিতে না পারায় সেগুলো ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। যেমন— শীতল পাটি, শতরঞ্জি, তাঁতবস্ত্র, তৈজসপত্র, কাঁসা-পিতল শিল্প, মৃৎ ও বুনন শিল্পের মতো অনেক ঐতিহ্য আমরা ধরে রাখতে পারিনি। প্রকল্পটি সফল হলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। সেই সাথে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। নিঃসন্দেহে এটি মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে টেকসই সুফল বয়ে আনতে পারে।

কিন্তু সংশয়ের কারণ থেকেই যায়। অতীতে বিদেশ থেকে ধারণা ধার করে অনেক প্রকল্প সরকারগুলো নিয়েছে; কিন্তু নানা কারণে ‘এক পরিবার এক চাকরি’র মতো প্রকল্পগুলো কাক্সিক্ষত সুফল দেয়নি।

এক গ্রাম এক পণ্য প্রকল্পে যাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকছে। মৃৎশিল্পীকে সমকালীন মানুষের রুচির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পণ্যের নকশা ও অলঙ্করণের প্রশিক্ষণ দিয়ে বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করে তোলা গেলে আমাদের চারু-কারুশিল্প বিশ্ববাজারেও জায়গা করে নিতে পারে।

ইতোমধ্যে এর কিছু নমুনা আমরা দেখেছি। আড়ং একচেটিয়া বাজার পেয়েছে। নকশিকাঁথা দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিদেশেও সমাদৃত হচ্ছে। এ সুযোগ ব্যাপক ভিত্তিতে কাজে লাগানো উচিত। এ জন্য দরকার আন্তর্জাতিক বাজারে উপযুক্ত ব্র্যান্ডিং ও সংযোগ স্থাপন। দরকার বাস্তবমুখী ও সমন্বিত নীতিমালার। সেই সাথে কারিগরদের জন্য বিশ্বমানের কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করা, জটিলতামুক্ত ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা এবং তার উদ্ভাবনী পণ্যের কপিরাইট ও জিআই সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি খাতের সঠিক সমন্বয়ও জরুরি। সমন্বয় ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত দুরূহ।