পানির অপর নাম জীবন— এ কথাটি এতবার উচ্চারিত হয়েছে যে এর গভীরতা অনেক সময় আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। অথচ বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা মনে করিয়ে দিচ্ছে, পানি শুধু জীবনধারণের উপাদান নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, নগর অর্থনীতি, শিল্পায়ন, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এমনকি জাতীয় নিরাপত্তারও অন্যতম ভিত্তি।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা থেকে শুরু করে অসংখ্য নদী-খাল এ দেশের ভূপ্রকৃতি ও জনজীবন গড়ে তুলেছে। কিন্তু নদীর দেশ হয়েও বাংলাদেশ ক্রমেই পানির এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি হচ্ছে— কোথাও অতিরিক্ত পানি, কোথাও নিরাপদ পানির সঙ্কট; কোথাও বন্যা, কোথাও খরা; কোথাও নদীর পানি দূষিত, আবার কোথাও ভূগর্ভের পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে।
ঢাকা ও এর আশপাশ, উত্তর-পশ্চিমের বরেন্দ্র অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলীয় এলাকা বিশেষভাবে ভূগর্ভের পানির ওপর নির্ভরশীল। অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে অনেক এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ঢাকার কিছু এলাকায় এই পতন বছরে কয়েক মিটার পর্যন্ত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘কত গভীরে পানি পাওয়া যাবে’—এতে সীমাবদ্ধ নেই। বরং জানতে হবে, এ পানি কোথা থেকে এসেছে, কত পুরনো, কত দ্রুত পুনর্ভরণ হচ্ছে, কোন পথে ভূগর্ভে প্রবেশ করছে এবং আমরা যতটুকু পানি তুলছি তার কতটুকু আবার প্রকৃতিতে ফিরে আসছে।
এই জায়গাতেই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে আইসোটোপ হাইড্রোলজি।
আইসোটোপকে সহজ ভাষায় পানির প্রাকৃতিক ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ বলা যায়। পানির অণুতে থাকা হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের বিভিন্ন আইসোটোপ—বিশেষ করে ডিউটোরিয়াম ও অক্সিজেন-১৮— পরিবেশের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার কারণে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। বৃষ্টির পানি, নদীর পানি, হ্রদ বা পুকুরের পানি এবং ভূগর্ভের পানির এই আইসোটোপিক স্বাক্ষর এক নয়।
বাষ্পীভবন, তাপমাত্রা, বৃষ্টির উৎস, ভৌগোলিক অবস্থান এবং মাটির ভেতরে পানির প্রবেশের পথ— সব কিছু পানির আইসোটোপিক বৈশিষ্ট্যে ছাপ রেখে যায়। ফলে পানির নমুনা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা তার উৎস, প্রবাহ এবং বিভিন্ন উৎসের পানির মিশ্রণ সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন; অর্থাৎ প্রচলিত পানি ব্যবস্থাপনা যেখানে মূলত ‘কত পানি আছে’ জানতে চায়, আইসোটোপ হাইড্রোলজি সেখানে জানতে চায়— এ পানি কোথা থেকে এসেছে এবং তার ভবিষ্যৎ কী।
ভূগর্ভের পানির বয়স কত? পানি ব্যবস্থাপনায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ভূগর্ভের পানির সবটুকু যে সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত থেকে এসেছে, তা নয়। কোনো পানি কয়েক বছর আগে ভূগর্ভে প্রবেশ করেছে, আবার কোনো পানি কয়েক শত বা হাজার বছর ধরে নির্দিষ্ট ভূতাত্ত্বিক স্তরে সঞ্চিত থাকতে পারে।
ট্রিটিয়াম, কার্বন-১৪সহ বিভিন্ন রেডিওআইসোটোপ ব্যবহার করে পানির বয়স বা অবস্থানকাল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে বোঝা সম্ভব, কোনো অ্যাকুইফার দ্রুত পুনর্ভরণযোগ্য নাকি সেখানে থাকা পানি মূলত দীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চিত ‘পুরনো’ পানি।
এ তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে অঞ্চলে পুনর্ভরণ অত্যন্ত ধীর, সেখানে যদি বেশি পরিমাণে ভূগর্ভের পানি তুলে নেয়া হয় তাহলে আগামী দিনে ভয়াবহ সঙ্কট দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সহযোগিতায় পরিবেশগত আইসোটোপ ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পানির ওপর গবেষণা হয়েছে। এই গবেষণা আরো বিস্তৃত জাতীয় পানি-তথ্য অবকাঠামোর অংশ করা গেলে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ঢাকার জন্য সতর্কবার্তা রয়েছে পানি নিয়ে। ঢাকার ভূগর্ভের পানির পরিস্থিতি এই প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে স্পষ্ট করে। রাজধানীর দ্রুত নগরায়ণ, বিপুল জনসংখ্যা, শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড এবং দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত ভূগর্ভের পানি উত্তোলন অ্যাকুইফারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
কিন্তু শুধু পানির স্তর কতটা নেমেছে, সেটি জানা যথেষ্ট নয়। দরকার পানির উৎস ও প্রবাহের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র।
যদি দেখা যায়, কোনো অ্যাকুইফারে প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ অত্যন্ত ধীর, তাহলে সেখানে উত্তোলন সীমিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। আবার কোথাও যদি নদী, খাল, জলাভূমি বা বৃষ্টির পানি কার্যকরভাবে ভূগর্ভের পানি পুনর্ভরণ করে, তাহলে সেই প্রাকৃতিক রিচার্জ অঞ্চল সংরক্ষণই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পানি নীতি।
এখানেই আইসোটোপ ডেটার সাথে ভূরাসায়নিক তথ্য, ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র, স্যাটেলাইট ডেটা ও পানি উত্তোলনের তথ্য একত্র করার প্রয়োজন রয়েছে।
উত্তর-পশ্চিমের বরেন্দ্র অঞ্চল বাংলাদেশের পানি সঙ্কটের আরেকটি বড় পরীক্ষাগার। শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য ভূগর্ভের পানির ওপর নির্ভরতা কৃষিকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু অতিরিক্ত উত্তোলন দীর্ঘমেয়াদে অ্যাকুইফারের ওপর চাপ তৈরি করছে।
এখানে শুধু প্রতি বছর কত পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, তা হিসাব করলে হবে না। জানতে হবে, বৃষ্টির কতটুকু মাটির নিচে যাচ্ছে, নদী-খাল থেকে কতটা পানি প্রবেশ করছে এবং উত্তোলিত পানির কতটা প্রাকৃতিকভাবে পুনর্ভরণ হচ্ছে।
আইসোটোপ ডেটাকে জলবায়ু ও পানিসম্পদ মডেলের সাথে যুক্ত করা গেলে বরেন্দ্র অঞ্চলের একটি বাস্তবসম্মত ‘পানি বাজেট’ তৈরি করা সম্ভব। তখন কৃষি পরিকল্পনাও হতে পারে পানির প্রাপ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নদী খননের সাফল্যও মাপতে হবে। বাংলাদেশে নদী ও খাল পুনঃখননে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই থেকে যায়— খননের ফলে ভূগর্ভের পানির পুনর্ভরণ বাস্তবে কতটা বেড়েছে?
এখানেও আইসোটোপ হাইড্রোলজি কার্যকর হতে পারে। কোনো নদী বা খাল পুনঃখননের আগে এবং পরে নদীর পানি ও আশপাশের ভূগর্ভের পানির আইসোটোপিক বৈশিষ্ট্য তুলনা করা গেলে বোঝা সম্ভব, খননের ফলে সত্যিই ভূগর্ভের পানিতে রিচার্জ বাড়ছে কি না; অর্থাৎ নদী খনন তখন শুধু মাটি কাটার প্রকল্প থাকবে না; এর পরিবেশগত ফলাফলও পরিমাপযোগ্য হবে।
পানি এখন ভূরাজনীতিরও বিষয়। পানি নিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় নদীগুলোর বেশির ভাগই আন্তঃসীমান্ত। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার অববাহিকার পানি একাধিক দেশের ভূগোল, কৃষি, অর্থনীতি ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
বিশ্বের অন্যান্য বড় নদী— মেকং, ইয়াংসিকিয়াং, নীল, ইউফ্রেটিস, দানিয়ুব—প্রমাণ করে, পানি কখনোই শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি কূটনীতি ও ক্ষমতারও উপাদান।
স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের বিখ্যাত কবিতার সেই বৈপরীত্য— ‘পানি, পানি সর্বত্র, অথচ পান করার মতো এক ফোঁটাও নেই’— ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য যেন আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। তবে বাংলাদেশের সামনে এখনো সুযোগ আছে। পানি সঙ্কটকে শুধু দুর্ভোগ হিসেবে না দেখে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে আইসোটোপ হাইড্রোলজি গবেষণাগার ও পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা, নিয়মিত আইসোটোপিক মানচিত্র তৈরি, ভূগর্ভের পানির বয়স ও পুনর্ভরণ অঞ্চল শনাক্ত করা এবং এসব তথ্য পানি নীতির সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
কারণ পানির ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রথম শর্ত হলো, আমাদের জানতে হবে, মাটির নিচে আসলে কী ঘটছে। বাংলাদেশে পানির অভাব হয়তো এক দিনে তৈরি হবে না। কিন্তু ভুল ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত উত্তোলন, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মিলিয়ে নিরাপদ পানির সঙ্কট দ্রুত গভীর হতে পারে। সেই অদৃশ্য সঙ্কটকে দৃশ্যমান করার শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার হতে পারে আইসোটোপ হাইড্রোলজি।
পানি তাই শুধু সম্পদ নয়; এটি একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। আর সেই ব্যবস্থার ‘জীবনকাহিনী’ পড়তে পারলেই খুলতে পারে বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তার নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক