কৃষি বাংলাদেশের প্রাণ। যে কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনি আর রোদে পোড়া ঘামের ওপর ভর করে ১৮ কোটি মানুষের মুখে দু’বেলা ভাত জোটে, সেই কৃষক যখন এক বস্তা সারের আশায় গভীর রাতে ডিলারের গুদামের সামনে এসে দাঁড়ান এবং সকালে খালি হাতে ফিরে যান— তখন বুঝতে হবে সঙ্কটটি কেবল সারের নয়, এটি আমাদের পুরো কৃষিব্যবস্থার এক ভয়াবহ রোগ।

সারের জন্য উত্তরের কৃষিপ্রধান জেলাগুলোতে আজ যে হাহাকার চলছে, তা শুধু একটি বা দু’টি উপজেলার ঘটনা নয়। কুড়িগ্রাম থেকে লালমনিরহাট, রাজশাহী থেকে চট্টগ্রাম— সবখানে আজ কৃষকের দীর্ঘশ্বাস আর ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। যে কৃষক সারা দেশকে ভাত জোগায়, সে আজ নিজের ক্ষেতের জন্য এক বস্তা সার পান না কেন?

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে সারের অরাজকতা নিয়ে কৃষকদের কান্নার যে ছবি উঠে এসেছে, তা যেকোনো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। কুড়িগ্রামের রৌমারীতে রাত ২টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও বেলা ১১টা পর্যন্ত ডিলারের দেখা না পেয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকরা গুদামের টিনের বেড়া ভেঙে সার নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এটি কোনো উচ্ছৃঙ্খলতা নয়, এটি ছিল নিজের ক্ষেতের ফসল বাঁচানোর শেষ আকুতি। ভুরুঙ্গামারীতে চাহিদামতো সার না পেয়ে ক্ষুব্ধ কৃষক রাস্তায় নেমেছেন। কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। লালমনিরহাটে ভোর থেকে ঘোরাঘুরি করেও সারের দেখা না পেয়ে কৃষকরা তিন জেলার সংযোগকারী মহাসড়ক স্তব্ধ করে দিয়েছেন। অন্য দিকে রাজশাহীর পুঠিয়ায় সিন্ডিকেট ভাঙার দাবিতে কৃষকরা রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করেছেন। চট্টগ্রামে চড়া দামে সার বিক্রির দায়ে ডিলারকে জরিমানা করতে দেখা গেছে।

দেশের মানচিত্রের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তের এই অভিন্ন করুণ ছবি প্রমাণ করে— অসাধু সিন্ডিকেটের শেকড় আজ কতটা গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ এই চরম সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের আমলাতন্ত্র যে ঠাণ্ডা মাথার মিথ্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে, তা অবাক করার মতো। সরকারি দফতরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ঘরে বসে দাবি করছেন— দেশে নাকি সারের কোনো অভাব নেই! তাদের মতে, কৃষকরা নাকি অহেতুক আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত সার জমা করছেন। এমনকি চোখের সামনে ঘটা গুদাম ভাঙার দৃশ্যকেও কোনো কোনো কর্মকর্তা নির্দ্বিধায় ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু তাদের এই খাতা-কলমের হিসাব মাঠের বাস্তবতার সামনে এসে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। কোনো কৃষক সানন্দে নিজের ঘুম হারাম করে মাঝরাতে গুদামের দরজায় এসে লাইন দেবেন না। যদি সত্যি সত্যি বাজারে সারের কোনো অভাব না থাকত। বাস্তবতা অস্বীকার করার এই আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা কৃষকের ক্ষোভকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, মাঠের বাস্তব ছবি আর স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে। দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো ইউনিয়নে সারের দাবিতে সড়ক অবরোধ হচ্ছে। কেন হচ্ছে? কারণ সরকারি গুদামে কত সার এলো। ডিলার কখন কিভাবে তা বিক্রি করবেন— এ তথ্য কৃষকের কাছে গোপন রাখা হয়। অন্ধকার এই পরিবেশ তৈরি করা হয় একটাই উদ্দেশ্যে— যাতে কৃত্রিম সঙ্কট বানিয়ে অসাধু ডিলাররা আড়ালে কালোবাজারি চালাতে পারেন। কৃষক যখন চোখের সামনে গুদামে সারের বস্তা দেখতে পান; কিন্তু তা হাতে পান না, আর সরকারের লোক যখন ‘সার পর্যাপ্ত আছে’ বলে প্রচার করেন, তখন কৃষকের মনে জমে থাকা আস্থার বাঁধ ভেঙে যায়। সেই ভাঙা আস্থা থেকে জন্ম নেয় বিক্ষোভ।

আমাদের দেশে সার বিতরণ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে এক অদৃশ্য ‘সিন্ডিকেটের’ দখলে। সরকার প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে সার আমদানি করে কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে; কিন্তু সেই সারের বড় অংশ চলে যায় ডিলার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। সরকারি বাফার গুদাম থেকে সার তুলে ডিলাররা তা গ্রামের বাজারে না পাঠিয়ে গোপন গুদামে লুকিয়ে রেখে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করেন। কৃষক যখন দিশাহারা হয়ে পড়েন, তখন সেই সার রাতের আঁধারে চড়া দামে কালোবাজারে বিক্রি করা হয়। ক্যাশমেমো না দেয়া, প্রতিটি বস্তায় নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেয়া এবং কৃষকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা— এসবই সিন্ডিকেটের তৈরি করা ফাঁদ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক ব্যাপার হচ্ছে, সারের এ কৃত্রিম সঙ্কট সরাসরি আঘাত হানছে আমাদের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তায়। রোপা আমনের এ ভরা মৌসুমে এবং উত্তরবঙ্গের আগাম সবজি ও ভুট্টা চাষের সময়ে যদি সারের অভাবে ফসলের শিষ না ফোটে, তবে সেই ক্ষতি পূরণ করা যাবে না। সার কেবল রাসায়নিক কোনো গুঁড়ো নয়, এটি ফসলের প্রাণ। সময়মতো সার না দিলে সবুজ ধানক্ষেত চোখের সামনে শুকিয়ে লাল হয়ে যায়। লালমনিরহাটের কৃষকের চোখের পানি প্রমাণ করে— সার না পেয়ে চোখের সামনে তাদের আমনের ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ কান্নার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো দেশের চালের বাজারে গিয়ে পড়বে।

সিন্ডিকেটের হাত থেকে চড়া দামে সার কিনতে গিয়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। দিনশেষে ফসল বিক্রি করতে গিয়ে কৃষক আবার সেই সিন্ডিকেটের কাছে হার মানেন— ন্যায্য দাম পান না। ফলে ফসল ফলিয়েও কৃষক দেনার দায়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।

আমাদের দেশে সার নিয়ে নীতিনির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা সাধারণ কৃষকের কোনো কাজে আসছে না। বন্দর পর্যন্ত সার আসার খবর টিভিতে দেখা গেলেও প্রান্তিক কৃষকের হাতে পৌঁছানোর শেষ ধাপে এসে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। কোন ইউনিয়নে প্রতিদিন কতটুকু সার এলো, সরকারি দাম কত— এ তথ্যটুকু যদি প্রতিটি বাজারে সহজ ডিসপ্লে বোর্ডে টাঙিয়ে দেয়া হতো, তবে ডিলাররা কোনো মিথ্যা সঙ্কটের অজুহাত দিতে পারত না।

এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে সরকারকে এখনই শক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব ডিলার সারের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করছেন বা কৃষকের কাছে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন— তাদের লাইসেন্স বাতিল করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে অসাধু ডিলারদের ছেড়ে দিলে এ সিন্ডিকেট থামবে না।

পাশাপাশি, প্রত্যেক কৃষকের জন্য সহজ ‘কৃষক কার্ড’ তৈরি করে জমির পরিমাণ অনুযায়ী সারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। সার বিতরণের দিনগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের উপস্থিতি নিশ্চিত করে সুশৃঙ্খলভাবে সার বিক্রি করতে হবে, যাতে কোনো কৃষককে রাত ২টায় এসে লাইনে দাঁড়াতে না হয়।

সরকারকে বুঝতে হবে, সারের গুদাম পাহারা দেয়ার চেয়ে দেশের অন্ন জোগানোর কারিগর কৃষকের সম্মান ও বিশ্বাস রক্ষা করা অনেক বেশি জরুরি। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে, কৃষক হাসলে নিশ্চিত হবে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা। সুতরাং সারের জন্য কৃষকের এ দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর খালি হাতে ফিরে যাওয়ার কান্না বন্ধ করতেই হবে। সারের পেছনের সব অসাধু সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে কৃষকের হাতে তার ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

ahabibhme@gmail.com