বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) যখন গঠন করা হয়, তখন সবমিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র ছয়টি। দেশে এখন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দেড় শতাধিক। উচ্চশিক্ষার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটলেও অভিভাবক ও তদারকি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউজিসি সেই পুরনো আমলের সক্ষমতা নিয়েই চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণা বৃদ্ধি, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে দীর্ঘ দিন থেকেই দেশের শিক্ষাবিদসহ বিদ্বজ্জনরা উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। অবশেষে সরকার ইউজিসিকে উচ্চশিক্ষা কমিশনে রূপান্তরের সেই সময়োপযোগী সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বিলুপ্ত করে একটি শক্তিশালী ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে ‘বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ‘বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫’-এর খসড়া প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টদের মতামত চাওয়া হয়েছে।
অধ্যাদেশের প্রস্তাবে বলা হয়েছে- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানের উপযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ইউজিসিকে উচ্চশিক্ষা কমিশনে রূপান্তর করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে নীতিমালা প্রণয়ন ছাড়াও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট প্রণয়ন ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব থাকবে এ কমিশনের ওপর। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তদারকি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সবধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মূল্যায়ন করবে এ কমিশন।
দেশে বিশ্ববিদ্যালয় আছে; কিন্তু তার অবকাঠামো নেই, অবকাঠামো আছে তো শিক্ষক নেই। আবার শিক্ষক আছে তো তাদের গবেষণা নেই। এমন অবস্থা সরকারি ও বেসরকারি মিলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান। উচ্চশিক্ষা কমিশনকে এর মানোন্নয়ন ও শৃঙ্খলার কাজে নেতৃত্ব দিতে হবে। অতীতেও উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সেই কমিশনে মন্ত্রণালয়ের আমলান্ত্রিক জটিলতার মধ্য দিয়ে হাত-পা বেঁধে দেয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা সমাজবিজ্ঞানী অ্যাডওয়ার্ড শিলস বলেছেন, ‘যারা শিক্ষকতাকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেন, যদি এর জন্য নৈতিক অঙ্গীকার তাদের না থাকে, তবে তারা শিক্ষক হিসেবে যোগ্য ব্যক্তি নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের জন্য সেটি এক অমার্জনীয় ঘাটতি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক এখন গবেষণা, সত্যনিষ্ঠ জ্ঞান আবিষ্কার ও জ্ঞান সৃষ্টির কাজ বাদ দিয়ে রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যে ধারণা তা ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন।
উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে এ খাতে প্রশাসক ও শিক্ষকদের গুরুত্ব অত্যধিক। সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও নৈতিকতাসম্পন্ন প্রশাসক যেমন নিয়োগ দিতে হবে, তেমনি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মানের দিক থেকে ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।
অতীতে ইউজিসি বছর শেষে উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের কাছে শুধু কিছু সুপারিশ করতে পারত। তা বাস্তবায়ন করা একান্তই সরকারের মর্জির ওপর নির্ভর করত। এখন কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে সেই রেওয়াজ থেকে সরে এসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা নিতে হবে।
উচ্চশিক্ষা কমিশন সত্যিকারার্থেই দেশের মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে- এটিই আমাদের প্রত্যাশা।