বিদ্যুৎ নেই। গ্যাস নেই। প্রয়োজনীয় সার নেই। এই তিন সঙ্কটে জনজীবন চাপে পড়েছে। প্রথমত, বিদ্যুৎহীনতায় তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন ও শিল্পকারখানা বিপর্যস্ত। দ্বিতীয়ত, গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তৃতীয়ত, গুদামে পর্যাপ্ত মজুদের কথা বলা হলেও কৃষক বাড়তি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। জাতীয় সংসদে গত বুধবার উঠে এসেছে দেশের জ্বালানি ও সারসঙ্কটের চিত্র। ফলস্বরূপ জনদুর্ভোগ। জাতীয় সংসদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বক্তব্যে সমস্যার ব্যাপ্তি স্পষ্ট। তাদের বক্তব্যে এটিও স্পষ্ট— এই সঙ্কট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। কথা হলো— সঙ্কটের কারণ ব্যাখ্যা কিংবা দুঃখ প্রকাশে জনগণের দুর্ভোগ কি লাঘব হবে?

সরকার যেমন নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি গ্যাস-বিদ্যুৎ চাহিদার ন্যূনতম সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অন্যদিকে মজুদ পর্যাপ্ত থাকার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে ন্যায্যমূল্যে সার পাচ্ছেন না কৃষক। সারে সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি— সরকারি গুদামে প্রায় ১৩ লাখ টন মজুদ থাকার পরও মাঠে কৃষক প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। তাদের মধ্যে চলছে হাহাকার। সরকার বলছে, একটি সঙ্ঘবদ্ধ চক্র কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করছে। প্রশ্ন হলো— চক্রের বিষয়টি জানার পরও কী কারণে তা ভাঙতে পারছে না? দুষ্টচক্র ভাঙনে বাধাটা কোথায়? অথচ গণমাধ্যমে প্রকাশ, মৃত ব্যক্তির নামেও আছে ডিলারশিপ। আছে নির্ধারিত এলাকার বাইরে ডিলারদের কার্যক্রম।

গুদাম ও মিল থেকে সার উদ্ধারের ঘটনা— এসব কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়। এগুলো বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। সার গুদামে আছে কি না; শুধু এটি যথেষ্ট নয়। তা কখন, কিভাবে এবং কোন মূল্যে কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে— সেটিই মুখ্য। তাই ডিলার নিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার পূর্ণ নজরদারি, উপজেলা ও ইউনিয়নভিত্তিক বরাদ্দের তথ্য প্রকাশ এবং অতিরিক্ত মূল্য আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

শুধু সারের ক্ষেত্রে নয়, বিদ্যুৎ-গ্যাসসঙ্কটও উদ্বেগজনক। দু’টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট বন্ধ। কমেছে বিদ্যুৎ আমদানি। অন্যদিকে গ্যাসের অভাবে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারছে না। সরকারের শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতের মধ্যে গ্যাস বণ্টনে ‘ভারসাম্য’ রক্ষার যুক্তি বাস্তব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি কোনো সমাধান নয়। কারণ, বিদ্যুৎ-গ্যাসের অনিশ্চয়তায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হচ্ছে। এই তিন সঙ্কট মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে জনজীবনকে চাপে ফেলেছে।

পক্ষকালের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস কিংবা ২০২৮ সালের মধ্যে নতুন এফএসআরইউ চালুর পরিকল্পনা ইতিবাচক। কিন্তু জনগণের প্রয়োজন শুধু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নয়। তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ। অতীত সরকারের ভুল নীতি বা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সঙ্কটের ব্যাখ্যা হতে পারে। এতে সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ নয়। বাস্তবতা হলো— জনঘনিষ্ঠ এ তিন সঙ্কটে চিঁড়েচ্যাপটা সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের পরিবার।

কৃষিমন্ত্রী সারসঙ্কটের মূলে দুষ্টচক্রের কথা জানিয়েছেন। বিদ্যুৎ-গ্যাসসঙ্কটে দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী। এই স্বীকারোক্তি জনদুর্ভোগ লাঘবে কোনো কাজ করবে না। সঙ্গত কারণে শুধু দায় স্বীকার নয়, বাস্তবভিত্তিক কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সরকারকে দ্রুত সঙ্কট মোকাবেলা করতে হবে। জনগণের দেখার বিষয় সমস্যার টেকসই উত্তরণে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। এখানেই সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ভর করছে।