হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতি হয়েছে। ছাত্র-জনতার বিস্ফোরণের পর তার পালানোর আগে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। রাষ্ট্রের সবক’টি প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহারে কুক্ষিগত করা হয়। গত বছরের ৫ আগস্ট ও তার আগে এর নগ্ন প্রকাশ ঘটে। এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০২৪ সালের গণতন্ত্র সূচকে। এক বছরে রেকর্ড ২৫ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। বাস্তবে দেশের মানুষ সরকারের কাছে চরম বঞ্চনার শিকার আগে থেকে হয়ে এলেও তার যথার্থ প্রতিফলন আন্তর্জাতিক সংস্থার সূচকে সময়মতো উঠে আসেনি।

ইআইইউ এবার ১৬৫টি দেশ ও দু’টি অঞ্চলের গণতন্ত্রের সূচক তৈরি করেছে। সংস্থাটির ২০২৩ সালে সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৫তম। এক বছরের ব্যবধানে এটি তলানিতে গিয়ে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বেনিনের সাথে শততম হয়েছে। পাঁচটি ক্যাটাগরিতে গণতন্ত্র চর্চার অবস্থা পরিমাপ করে দেখেছে ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স। এগুলো হচ্ছে নির্বাচনপ্রক্রিয়া ও বহুত্ববাদ, সরকারের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নাগরিক স্বাধীনতা। ইআইইউর পরীক্ষণে প্রতিটি ইস্যুতে এক বছরে স্কোরের বড় পতন দেখা যাচ্ছে। সংখ্যাতত্ত্বে ২০২৪ সালে এটি বড় আকারে প্রতিভাত হলেও বাস্তবে হাসিনা আমলের শুরু থেকে গণতন্ত্রের প্রতিটি শাখায় গুরুতর অবনতি হয়েছে। হাসিনার নির্বাচনপ্রক্রিয়া ভোটদান ও প্রার্থীদের অংশগ্রহণ পুরোপুরি সরকারের ইচ্ছার কাছে অসহায় হয়ে যায় ২০১৪ সালে সংসদ নির্বাচনের সময়। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের সেই নির্বাচনের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। সংসদের অর্ধেকের বেশি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে কেউ মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারেননি। পরবর্তী দু’টি নির্বাচনের একটি ‘রাতে ভোট’ ও অন্যটি ‘ডামি নির্বাচন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

মোটকথা, নির্বাচনপ্রক্রিয়া হাসিনা সরকার ২০১৪ সাল থেকে অকার্যকর করে ফেলে। স্থানীয় সরকারের সর্বস্তরে নির্বাচনে একই ধরনের জবরদস্তি দেখা গেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন বলতে যা বোঝায় হাসিনার আমলে তা তিরোহিত হয়। গণতন্ত্রে বিভিন্ন দল ও ব্যক্তি নিয়মের মধ্যে থেকে পরস্পর প্রতিযোগিতা করে থাকে। সবার লক্ষ্য থাকে জনগণের কল্যাণ করা। অথচ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে দেখা হয়েছে শত্রু হিসেবে। হাসিনার ফ্যাসিবাদী জমানায় অপরাপর দলকে রাজনৈতিক পরিসর থেকে উৎখাত করা হয়। এ কাজ করতে গিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র¿কে হাতিয়ার বানানো হয়। একে রাজনৈতিক অবস্থার অবনতি নয়; বরং বলা যায় দেশে কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছিল না।

ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্সসহ কয়েকটি বৈশ্বিক সংস্থা গণতন্ত্র মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো উন্নতি-অবনতি পর্যবেক্ষণ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতারও একটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশ থেকে গণতন্ত্র মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নির্বাসিত হলেও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সেসব ঠিকভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। এসব সংস্থা বাংলাদেশকে দেখিয়েছে ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র হিসেবে। কার্যত বাংলাদেশ তখন সম্পূর্ণ একটি স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। দেশের গণতন্ত্র মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার ঠিক রাখতে হলে সর্বপ্রথম নিজেদের সোচ্চার হতে হয়। এর অবনতি হলে অবক্ষয় রোধে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামার কোনো বিকল্প নেই।