বিলম্বে হলেও ভোটব্যবস্থা ধ্বংসে নেতৃত্বদানকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ ক্রমাগত মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে। ফলে একটি বর্বর শাসন শেখ হাসিনা জাতির ওপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হন। এ কাজে সহযোগিতা করেছেন তার নিয়োগ দেয়া নির্বাচন কমিশনার এবং কিছু সামরিক-বেসামরিক আমলা। বিএনপি সাবেক তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ ২৪ জনকে আসামি করে মামলা দায়েরের পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হওয়ায় মানুষ খুশি।
নব্বই দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দ্বিদলীয় ধারার বিকাশ শুরু হয়েছিল। মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সংস্কৃতি চালুর মাধ্যমে এ ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হয়। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা এ ব্যবস্থা বাতিল করে বিপর্যয় সৃষ্টি করেন। ওই বছর একটি একচেটিয়া নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করেন। সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ এ কাজে শেখ হাসিনার জবরদস্তি নির্বাচনের সহযোগী হয়ে আসেন। দেখা গেল, জাতীয় সংসদের অর্ধেকের বেশি ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় হতাশ নাগরিকরা বাকি আসনগুলোতেও ভোটকেন্দ্রে হাজির হননি। দিন শেষে রকিব কমিশন বিপুল ভোটের উপস্থিতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে। ওই নির্বাচনটি ভোটারবিহীন নির্বাচন হিসেবে কুখ্যাতি পায়। এর পরে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে দেখা যায়। আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, নির্বাচনসংশ্লিষ্টরা নির্বাচন কমিশনের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি; সিইসি কে এম নুরুল হুদা আগের রকিব কমিশনের মতো সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার দাবি করেন। ওই নির্বাচনে শেখ হাসিনার জোট ২৮৮ আসন নিজের ঝুলিতে ভরে। এ নির্বাচন নিশিভোট হিসেবে তকমা পায়।
২০২৪ সালের নির্বাচনকে শেখ হাসিনা ছেলেখেলা বানিয়ে ফেলেছিলেন। কোথায় তার দলের মনোনীত প্রার্থী জয়ী হবেন, কোথায় বিরোধী প্রার্থী জয়ী হবেন আর কোথায় স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হবেন- এসব তিনি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ কাজে তিনি ব্যবহার করেন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল ছিলেন শেখ হাসিনার টিমের একজন সদস্যমাত্র। আগের নির্বাচনগুলোর মতো তিনি শুধু ভোটের নামে এই জালিয়াতিকে বৈধতা দেন। এবার এই ভোটের নাম হাসিনা নিজেই দেন ‘ডামি’ নির্বাচন। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রত্যেকটি স্তরে এভাবে জালিয়াতি হয়েছে। শেখ হাসিনা ও নির্বাচন কমিশনারদের সমন্বয়ে একটি চক্র শুধু নাগরিকদের ভোটাধিকার বঞ্চিত করে গেছে তাই নয়; উপরন্তু সরকারি তহবিল থেকে বিপুল অর্থ খরচ করে জনগণকে নিয়ে অব্যাহত হাসিঠাট্টা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাগ্রহণের পরপর মানুষ আশা করেছিল- এ জালিয়াতদের বিরুদ্ধে অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। শেষ পর্যন্ত ১১ মাস পর বিএনপি মামলা দেয়ার পর সিইসি নুরুল হুদাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মানুষের আশা, একটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ভোটাধিকার হরণে যারা শেখ হাসিনার সহযোগী ছিলেন; তাদের প্রত্যেককে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। মনে রাখতে হবে, এ গুরুতর অপরোধের উপযুক্ত বিচার না হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা খুব কঠিন হবে।