সারা দেশে মাটির উর্বরা শক্তি নানা কারণে নষ্ট হচ্ছে। রাসায়নিক সারের অপরিকল্পিত ও অসম ব্যবহার এর অন্যতম কারণ। তার সাথে যোগ হয়েছে মাটিতে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রাণী ও কীটপতঙ্গের জীবনচক্র ধ্বংসের পরিণতি।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলাসহ সারা দেশে মাটির উর্বরা শক্তির ভারসাম্য অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের গবেষকদের গবেষণায় দেখা যায়, ১৬টি জেলার মাটিতে জৈবপদার্থের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে। শুধু উত্তরাঞ্চল নয়; বরং সারা দেশে মাটির উর্বরা শক্তির উপস্থিতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ- মাটিতে বিভিন্ন ধরনের জৈবপদার্থ, খনিজ উপাদান যে পরিমাণে থাকার কথা, তা নেই। যেমন- মাটিতে শূন্য দশমিক ২৭ থেকে শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ নাইট্রোজেন থাকা উচিত। আছে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৯ থেকে শূন্য দশমিক ১৮ মাত্রা পর্যন্ত। সালফার থাকা প্রয়োজন ২২ দশমিক শূন্য ৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। সেটিও আছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

এর ফল হচ্ছে ভয়াবহ। কৃষকরা রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন; কিন্তু তাতে সুফল পাচ্ছেন না; বরং সার ব্যবহারে শুধু আর্থিক অপচয় হচ্ছে। অবশ্য কৃষকরা সার প্রয়োগে মাত্রা ঠিক রাখতে পারেন না। জমিতে কোন সার কতটা দিতে হবে- বেশির ভাগ কৃষক তা জানেন না। ফলে অনুমানের ওপর নির্ভর করে সার প্রয়োগ করেন। এতে মাটি ও পরিবেশের ক্ষতি হয় আরো বেশি, আরো দ্রুত। পাশাপাশি রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে মাটিসংলগ্ন জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যায়। মাটির কেঁচো, ব্যাঙসহ নানা ধরনের কীটপতঙ্গ ও অণুজীবের জীবনচক্র এর মধ্যে প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।

দেশে একসময় ২০ প্রজাতির ব্যাঙ ছিল। এখন গ্রামে ব্যাঙ প্রায় দেখাই যায় না। অথচ ফসলের কীট দমনে ব্যাঙ সবচেয়ে কার্যকর প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। একসময় কৃষিকাজে প্রত্যেক বাড়িতে গরু লালন-পালন করা হতো। গবাদিপশুর বর্জ্য ও বিভিন্ন গাছপালা পচনের পর যে জৈব উপাদান তৈরি হতো; তা কৃষকরা জমিতে ছিটিয়ে দিতেন। এখন যান্ত্রিক উপায়ে জমি চাষ হয়। কৃষকের বাড়িতে গরু বেশি নেই। ধঞ্চেজাতীয় গাছ পচিয়ে জৈবসার করার মতো বাড়তি জমিও নেই বেশির ভাগ কৃষকের। ফলে মাটিতে জৈব উপাদান ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। এর পরিণাম নিয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন; কিন্তু তাতে তেমন কাজ হয়েছে বলে মনে হয় না। কৃষকরা কৃষিজমির মাটি পরীক্ষা করে তার চাহিদা অনুযায়ী সার প্রয়োগের বিষয়ে এখনো সচেতন নন। অথচ দেশে কৃষি সম্প্রসারণ দফতরসহ কৃষিবিষয়ক অসংখ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর কাজ মাঠপর্যায়ে কৃষকদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়া।

মাটির উর্বরা শক্তি নষ্ট হওয়া রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। তা করতে হবে এখনই। এ জন্য কৃষি সম্প্রসারণ দফতরের কর্মীদের সক্রিয় করতে হবে। সেই সাথে মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে এবং চাহিদা অনুপাতে জমিতে সার প্রয়োগের বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করতে জাতীয়পর্যায়ে বিশেষ প্রচারমূলক কর্মসূচি নেয়া যেতে পারে।