দেশে দিন দিন বায়ুদূষণ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এটি বহু দিন ধরে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। অবস্থা এত নাজুক যে, বায়ুদূষণে বাংলাদেশীদের গড় আয়ু কমছে সাড়ে পাঁচ বছর। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয়- বায়ুদূষণে শিশুমৃত্যুর হার মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া। গত তিন দিন আগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, বায়ুদূষণে ২০২১ সালে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১৯ হাজারের বেশি শিশু মারা গেছে। অর্থাৎ, প্রতি ঘণ্টায় মারা গেছে দুই শিশু। দেশে বায়ুদূষণজনিত রোগে শিশুরা অধিক হারে আক্রান্ত হওয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা গোষ্ঠী জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের (জেডসিএ) এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। ‘স্ট্রাকচারাল ডিপেনডেন্সিস পারপেচুয়েট ডিসপ্রোপোরশনেট চাইল্ডহুড হেলথ বার্ডেন ফ্রম এয়ার পলিউশন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি গত বুধবার প্রকাশ করা হয়।

বায়ুদূষণের অভিঘাত শিশুদের ওপর কত তীব্র তা বোঝা যায় জেডসিএ’র প্রতিবেদন পাঠে। এতে বলা হয়েছে, শিশুদের জীবনের জন্য যত ধরনের ঝুঁকি আছে, তার মধ্যে বায়ুদূষণ দ্বিতীয় সবচেয়ে প্রাণঘাতী। ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মোট মৃত্যুর ১৫ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল বায়ুদূষণ। দেশে বেশ কয়েক বছর ধরে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা নিয়ে শিশুদের হাসপাতালে ভর্তির হার বেড়েছে। বিশেষ করে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস ও অ্যাজমা সমস্যা এখন উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে শিশুদের। যক্ষ্মার প্রবণতাও বাড়ছে। নিউমোনিয়া-জাতীয় শ্বাসযন্ত্রের রোগে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের যত মৃত্যু হয়, তার ৪০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে বায়ুদূষণ দায়ী।

শিশুদের ওপর দূষিত বায়ুর গুরুতর কিছু প্রভাব জেডসিএ’র প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শিশুরা বিশেষভাবে বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকে। জন্মের পর শুরুর বছরগুলোতে বায়ুদূষণের সংস্পর্শে আসা শিশুদের আচরণসহ জ্ঞানগত সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে প্রমাণ মিলেছে। বাইরের বায়ুদূষণ ২০ শতাংশ কমানো গেলে শিশুর স্মরণশক্তি ৬ শতাংশের বেশি পর্যন্ত বাড়তে পারে।

২০২০-২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার হাসপাতালভিত্তিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মধ্যে চার বছরের কম বয়সী শিশুরা আছে। মোট পিএম ২.৫-জনিত শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ২৮ শতাংশ এ বয়সী শিশু। এ সময়কালে ঢাকার বাতাসে পিএম ২.৫-এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।

আমাদের দেশে মূলত গৃহস্থালি ও বাইরের পরিবেশের জন্য বায়ুদূষণ হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে বায়ুদূষণজনিত বেশির ভাগ শিশুমৃত্যুর জন্য গৃহস্থালি উৎসকে দায়ী করা হয়। তাই রান্নায় পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব জ্বালানির রূপান্তর ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। এতে দেশে প্রতি বছর ১৬ হাজার ২৬৪টি শিশুর মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার, রান্নায় উন্নতমানের চুলা প্রচলন কিভাবে করা যায়। সেই সাথে গ্রামীণ এলাকায় ব্যাপকভাবে সৌরশক্তিচালিত চুলা করা, এলপিজি বা এলএনজির ব্যবহারে উৎসাহিত করতে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি নেয়া যেতে পারে। সেই সাথে সারা দেশে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তবেই আশা করা যায়, বায়ুদূষণ কমে আসবে।

শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। যেকোনো মূল্যে তাদের জীবনের সুরক্ষা দেয়া আমাদের কর্তব্য। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো, কর্তৃপক্ষের দিক থেকে এ নিয়ে কোনো টেকসই, সমন্বিত ও দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তাই এ কথা বলা অযৌক্তিক হবে না যে, দু-একটা ইটভাটা ও গাড়িকে জরিমানা করে বায়ুদূষণ সমস্যার সমাধান করা যাবে না।