পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় জীবনযাত্রায় মানুষের প্রধান লক্ষ্য থাকে ভোগ। জীবন যেন প্রতিযোগিতার মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার এক অনন্ত যুদ্ধে পরিণত হয়। নিজের সক্ষমতা চিন্তা না করে অপরের দিকে তাকিয়ে তার মতো করে নিজেকে গড়ার স্বপ্নে বিভোর বেশির ভাগ মানুষ। চাকচিক্যময় জীবন হয় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। এমন জীবন পেতে ব্যর্থ হলে হতাশার অতল গহ্বরে ডুবে যায় অনেকে। কখনো নিজেই নিজের জীবন শেষ করতে আত্মহননের পথ বেছে নেন।

একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত- এই পাঁচ বছরে দেশে ৭৩ হাজার ৫৯৭ জন আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ- বছরে গড়ে ১৪ হাজার ৭১৯ জন আত্মহত্যা করেছেন। সেই হিসাবে দৈনিক ৪০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১২ হাজার ৩৩৫টি ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ- দৈনিক গড়ে আত্মহত্যার সংখ্যা প্রায় একই (সামান্য বেশি-৪১টি)।

পুলিশের ভাষ্যমতে, সারা দেশে ৬৪ জেলার মধ্যে আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর মামলা সবচেয়ে বেশি যশোরে। ২০২২-এর অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই জেলায় এ-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে এক হাজার ৪৫৪টি। এরপর ঢাকা জেলায়- এক হাজার ৪০২টি। তৃতীয় স্থানে আছে কুমিল্লা। এ জেলায় একই সময় মামলা হয়েছে এক হাজার ২৮৮টি।

বাংলাদেশের মতো সমাজব্যবস্থায় মানুষের এমন আত্মহত্যার হার শুধু অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, রীতিমতো উদ্বেগজনক। আত্মহত্যার এমন প্রবণতা এটিই ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও আত্মহত্যা যে ইসলামে নিষেধ; ধর্মীয় সেই অনুশাসনে কার্যত শিথিলতা দেখা দিয়েছে। তাই আত্মহত্যা রোধে মানুষের মধ্যে ধর্মীয় অনুশাসন বাড়াতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানসিক বিপর্যয় ঘটলে মানুষ আত্মহত্যা করে। কিছু মানসিক রোগও আত্মহত্যার জন্য দায়ী থাকে। বাংলাদেশে অন্যান্য অনেক চিকিৎসাব্যবস্থা বেশ উন্নত হলেও মানসিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে তেমনটি লক্ষ করা যায় না। রাজধানীকেন্দ্রিক মানসিক চিকিৎসাব্যবস্থা থাকলেও জেলা-উপজেলা কিংবা গ্রামকেন্দ্রিক এই চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল। অথচ আত্মহত্যার এ উচ্চহার নির্দেশ করছে- এখন মানসিক চিকিৎসা কত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এ জন্য সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে মানসিক রোগের চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে হবে। এ চিকিৎসাব্যবস্থায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির ওপরও জোর দেয়া প্রয়োজন। যাতে করে মানুষ সহজে তাদের কাছে সেবা পেতে পারেন।

আত্মহত্যা বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মানুষ সেসবে ডুবে থেকে মানুষের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নিঃশেষ করে, যা তাকে এক সময় নিঃসঙ্গ করে দেয়। মানুষের একাকিত্বের এই অচলায়তন ভাঙতে হবে।

কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল বলেছেন, ‘নিজের সত্তাকে এত শক্তিশালী করো, যাতে ভাগ্য নির্ধারণের আগে আল্লাহ স্বয়ং তোমার কাছে জানতে চান, বলো- তোমার আকাঙ্ক্ষা কী?’ (খুদি কো কর বুলন্দ ইতনা কে হর তকদির সে পেহলে, খুদা বান্দে খুদ পুঁছে বাতা তেরি রেজা কিয়া হ্যায়।)

আজকের মানুষের জীবনের পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। দরকার জীবনদর্শন পরিবর্তনের। তবেই না-পাওয়ার হাহাকার থেকে মুক্তি সম্ভব। সম্ভব আত্মহত্যার মতো জীবনবিনাশী পথ থেকে বেঁচে থাকার। যদিও আত্মহত্যা একটি ব্যক্তিগত বিষয়, তবে এটি বন্ধে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।