ক্রিকেটে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে যে নিরাপত্তা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেটা কেবল বাংলাদেশ দলের অংশ নেয়ার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নেই। এই বিতর্ক আইসিসির নিরপেক্ষতা এবং ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড় মোস্তাফিজুর রহমান দলে থাকলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে, সমর্থকরা জার্সি পরলেও ঝুঁকি থাকবে। এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ দলের ঝুঁকি তত বাড়বে। এসব যুক্তি কেবল অদ্ভুত নয়, বিপজ্জনকও।
নিরাপত্তা ইস্যুতে ভেনু পরিবর্তন ক্রিকেটে নতুন কিছু নয়। এর আগে এমন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে খোদ ভারত। গত বছর মার্চে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির স্বাগতিক দেশ ছিল পাকিস্তান। কিন্তু বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতির অজুহাতে পাকিস্তানে গিয়ে খেলতে চায়নি ভারত। এতে ভারতের সব ম্যাচ সরিয়ে নেয়া হয় দুবাইয়ে। ভারতের এমন উদাহরণ অসংখ্য।
১৯৯৬ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করেছিল ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় খেলতে রাজি হয়নি। ২০০৩ সালে জিম্বাবুয়েতে গিয়ে খেলতে রাজি হয়নি ইংল্যান্ড। সেসব ক্ষেত্রে আইসিসি বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছে। তাহলে বাংলাদেশ একই দাবি তুললে সেটিকে ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখা হবে কেন?
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা শঙ্কা কেবল অনুমান নয়। ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ দেখিয়ে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, ভারতের পরিবেশ স্বাভাবিক নয়। আইসিসির নিজস্ব নিরাপত্তা চিঠিতেই ঝুঁকির কথা স্বীকার করা হয়েছে। এই বাস্তবতায় বিকল্প ভেনুর দাবি করা কোনো ছাড় চাওয়া নয়; বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত অধিকার প্রয়োগ করা।
কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আইসিসি কেন বিতর্ক সৃষ্টি করছে? এখানেই প্রশ্ন ওঠে সংস্থাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে। পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার সাঈদ আজমল মন্তব্য করেছেন, আইসিসি যদি বিসিসিআইয়ের প্রভাবমুক্ত না হতে পারে, তবে এই সংস্থার প্রয়োজনীয়তাইবা কী!
আইসিসির বর্তমান চেয়ারম্যান জয় শাহ। তিনি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে। সেই বাস্তবতায় আইসিসির নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় অমূলক নয়। পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়া, ভেনু বয়কটসহ ভারতের জন্য সুবিধাজনক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বিভিন্ন সময়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা গেল উল্টো সিদ্ধান্ত।
শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে আশ্রয় দেয়ার পর নানা ইস্যুতে বাংলাদেশকে চাপে রাখতে চাইছে ভারত। মোস্তাফিজ তেমনই একটি ইস্যু। বিসিবির অবস্থান এখানে স্পষ্ট। দেশের মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে নিরাপত্তাহীন দেশে খেলতে যাবে না বাংলাদেশ। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের ম্যাচ আয়োজনে আগ্রহ দেখিয়েছে পাকিস্তান। আইসিসির ভেবে দেখার সুযোগ আছে।
বিশ্বকাপে খেলতে না পারলে বাংলাদেশের আর্থিক ও প্রতিযোগিতামূলক ক্ষতি হবে, এতে সন্দেহ নেই। এমনকি আইসিসির একপক্ষীয় নীতি অব্যাহত থাকলে ক্রিকেট থেকেও ছিটকে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। কিন্তু একটি সার্বভৌম দেশ কারো অন্যায় চাপে নতি স্বীকার করতে পারে না।
বাংলাদেশের সামনে করণীয় তাই একটিই। আইসিসির কাছে দৃঢ়ভাবে নীতিগত অবস্থান তুলে ধরা। স্পষ্ট ভাষায় বলতে হবে, ক্রিকেট কোনো দেশের রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির কাছে জিম্মি হতে পারে না। বিষয়টি নিয়ে নিয়মিতভাবে আইসিসির সাথে বিসিবির উচ্চপর্যায়ের সংলাপ জরুরি।
সঙ্কট কেবল বাংলাদেশের নয়। ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশ বৈষম্যের শিকার হতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে স্বচ্ছতা রক্ষায় আইসিসিকে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে।
আশা করব, আইসিসি বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি পুনর্বিবেচনায় নেবে।