অবশেষে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার চীনা ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য দেশটির কাছে ৫৫ কোটি ডলার বা ছয় হাজার ৭১০ কোটি টাকার ঋণ চেয়েছে। আর চীন সরকার চুক্তির খসড়া তৈরি করছে। সমীক্ষাও চালাচ্ছে। ঋণচুক্তির খসড়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ইআরডিতে পাঠানো হবে। এর মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করবে। এরপর স্বাক্ষরিত হবে ঋণচুক্তি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘদিনের সিদ্ধান্তহীনতা ছিল। ভারত না চীন কাকে দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে দ্বিধাদ্ব›দ্ব চলছিল। ভারতের সমর্থনে অবৈধভাবে ১৫ বছর ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা শেখ হাসিনার পছন্দ ছিল ভারত। সবশেষ চীন সফর শেষে এ বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘চীন তো রেডি কিন্তু আমি চাচ্ছি যে এটি ইন্ডিয়া করে দিক।’
কিন্তু ভারত আন্তর্জাতিক নদী তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশের সাথে কখনোই বন্ধুসুলভ আচরণ করেনি। অবশ্য ৫৪টি অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রেই একই কথা সত্য। ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অধিকার উপেক্ষা করে উজানে বাঁধ দিয়েছে ভারত এবং একতরফা পানি সরিয়েছে। বাংলাদেশের সাথে পানিবণ্টনের চুক্তি করেনি। চুক্তি না থাকায় তিস্তার পানিপ্রবাহে বাংলাদেশের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই; বরং ভারত শুকনা মৌসুমে পানি আটকে দিয়ে এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে ফসলের বিপুল ক্ষতিসহ নানাভাবে কষ্ট দিচ্ছে তিস্তাপাড়ের কোটি কোটি মানুষকে। এ জন্যই তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি তুলেছে তিস্তাপাড়ের জনগোষ্ঠী।
চলতি বছরেই দুই দেশের মধ্যে আর্থিক চুক্তি হতে পারে। প্রকল্পের প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পেলে ২০২৬ থেকে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।
এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নদীর পানিপ্রবাহ নিশ্চিত হবে, বদলে যাবে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের ভাগ্য। শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য ভারতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। নদীর গভীরতা প্রায় ১০ মিটার বাড়বে। ফলে বন্যার আশঙ্কা কমবে। সারা বছর নৌচলাচলের মতো পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা যাবে। প্রকল্পের বিভিন্ন অনুষঙ্গের মধ্যে থাকতে পারে ১০৮ কিলোমিটার নদী খনন, নদীর দু’পাড়ে ১৭৩ কিলোমিটার তীর রক্ষা, চর খনন, নদীর দুই ধারে স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ, বালু সরিয়ে কৃষিজমি উদ্ধার ও এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা এবং প্রতি বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন ইত্যাদি। এ ছাড়া নৌবন্দর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যবস্থা থাকবে।
এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তিস্তাপাড় হয়ে উঠবে পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির মতো সুন্দর নগরী। চীনের হোয়াংহো নদী একসময় ছিল চীনের দুঃখ। সেই নদী শাসন করায় চীনের মানুষের দুঃখ ঘুচেছে।
তিস্তাপাড়ের পাঁচটি জেলা- লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার মানুষ চায় পরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন। চীনের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলেও তারা সন্তুষ্ট। কারণ ভারতের বৈরিতায় অতিষ্ঠ মানুষ দেশটির ওপর চরম নাখোশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত যথার্থ। এটি যত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে, ততই মঙ্গল।