টাকায় সব মেলে কারাগারে, গণমাধ্যমে এমন শিরোনাম প্রায়শ দেখা যায়। মাঝে মধ্যেই এসব সংবাদে কারাগারের নানা অসঙ্গতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ পায়। কিন্তু এ নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয় কমই। ফলে যাবতীয় অনিয়ম, দুর্নীতি অব্যবস্থাপনা যথারীতি চলতেই থাকে।

একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কারাগারের ভেতরে আর্থিক লেনদেনের এক ‘অদৃশ্য’ নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। বন্দীদের নানা সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা করতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে স্বজনরা টাকা পাঠাচ্ছেন কারারক্ষীদের কাছে। বিনিময়ে বন্দীদের কারাগারেই মিলছে মোবাইল ফোন ব্যবহার, মাদকসেবন, বাইরের খাবার কিংবা ফাঁকিবাজির সুযোগ। এই অবৈধ লেনদেনে কোনো কোনো কারারক্ষী ধরা পড়লেও এসব বন্ধ হচ্ছে না। কারা কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ তদন্তে এ রকম অবৈধ লেনদেনের তথ্য উঠে এসেছে। অনেক কারারক্ষী নিজের বা বিশ্বস্ত আত্মীয়-পরিজনের নগদ, বিকাশের মতো বিভিন্ন মোবাইলে আর্থিক সেবার নম্বর দিয়ে থাকেন বন্দীর স্বজনদের। ওই নম্বরে প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা ঢুকছে। সেবা দেয়ার বিনিময়ে কারারক্ষীরা পান কমিশন।’

একজন বন্দীর নিজের প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য কারা কর্র্তৃপক্ষের কাছে বৈধভাবে অর্থ রাখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই বৈধ সুযোগের বাইরে অবৈধ লেনদেনের সুযোগ নেন সামর্থ্যবান বন্দীরা। যাদের সামর্থ্য নেই তারা কোনো সেবা পান না।

গত ফেব্রুয়ারিতে সাবেক মন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব:) ফারুক খানের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়। বন্দী ফারুক খান সেই স্ট্যাটাসে শেখ হাসিনাবিহীন আওয়ামী লীগ চান বলে মন্তব্য করেন। বিত্তবান ও প্রভাবশালীরা যে কারাগারে বসে যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন, এ ঘটনা তারই প্রমাণ।

বন্দীদের মৌলিক চাহিদা পূরণ কারা কর্তৃপক্ষের কর্তব্য। কিন্তু তারা সে দায়িত্ব পালন না করে দুর্নীতিতে জড়িত হচ্ছেন। অনেক জেল সুপারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও তাদের কদাচিৎ শাস্তি হয়। তাই ‘রাখিব নিরাপদ দেখাব আলোর পথ’-স্লোগানে পরিচালিত হলেও কারাগারগুলো আলোর পরিবর্তে নিজেই অন্ধকারে নিমজ্জিত। এই পরিস্থিতিতে কারাগার ব্যবস্থাপনায় আমূল সংস্কার দরকার।

গত বছরের অক্টোবর মাসে রাজধানীতে কারা সংস্কারবিষয়ক এক কর্মশালায় বলা হয়, কারাগারের মূল উদ্দেশ্য অপরাধীর সংশোধন। জেলগুলো মূলত ১৮৬০ সালের জেলকোড, দ্য প্রিজন্স অ্যাক্ট ও দ্য প্রিজনার্স অ্যাক্ট আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ঔপনিবেশিক আমলের এসব আইন সংশোধন করে জেলব্যবস্থা সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

কারাগারে যেহেতু মানুষ বাস করে সেহেতু মানবীয় দিকগুলো বিবেচনা করে তাদের সংশোধন কার্যক্রম চালাতে হবে। বন্দীদের সুযোগ-সুবিধা যেন কোনোভাবেই কারা কর্তৃপক্ষ ভক্ষণ করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সাথে কারা কর্তৃপক্ষের অনিয়ম, অসঙ্গতি ও দুর্নীতির বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কারাগার প্রকৃত অর্থেই সংশোধনাগার হয়ে উঠবে, এটিই প্রত্যাশিত।