দেশের পোলট্রি শিল্পে সঙ্কট বেড়েছে। মূল সমস্যা উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, উৎপাদিত ডিমের দর কমে যাওয়া এবং বিপণনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। আছে বৃহৎ পুঁজির দুষ্টচক্র। এদের কারণে ছোট ও মাঝারি খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

পোলট্রি শিল্প অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি প্রধানত গ্রামীণ অর্থনীতিতে শক্তি জোগায়। খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করে। প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগসমৃদ্ধ এ খাতে সরাসরি ২৫ লাখ মানুষ জড়িত।

পরোক্ষভাবে আরো ৬০ লাখের বেশি মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। সারা দেশে ছোট-বড় প্রায় এক লাখ খামার রয়েছে। এগুলো থেকে বছরে গোশত উৎপাদন হয় ১৪ লাখ ৬০ হাজার টন, যা দেশের মোট চাহিদার ৪০-৪৫ শতাংশ। পাশাপাশি প্রতিদিন ডিম উৎপাদন হয় চার থেকে সাড়ে চার কোটি।

সব মিলিয়ে খাতটি খুব গুরুত্বপূর্ণ হলেও পোলট্রি শিল্পে নানা সমস্যা বিদ্যমান। বড় সমস্যা হলো বিপণন মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। ডিম ও মুরগির সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশ এদের নিয়ন্ত্রণে। এরা সরকারের বেঁধে দেয়া দাম খামারিদের দেয় না। বাধ্য হয়ে খামারিরা কম দামে ডিম ও মুরগি বিক্রি করেন। এভাবে এ খাতে খামারিদের প্রতি মাসে হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির শিকার হতে হয় বলে তাদের দাবি। এটি গবেষণাভিত্তিক তথ্য না হলেও খামারিদের বঞ্চনার বিষয়টি অমূলক নয়।

আর্থিক ক্ষতি এবং প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে গত কয়েক বছরে বেশ কিছু পোলট্রি খামার বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে আরো অনেক খামার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাতে যেমন অনেকে বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন; তেমনি পোলট্রির বাজার পুরোপুরি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তখন এই খাতে প্রতিযোগিতা কমবে, ভোক্তাপর্যায়ে দাম বেড়ে যাবে। করপোরেট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সিন্ডিকেট এখনো পোলট্রি খাদ্যসহ নানা উপকরণের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। খাবারের প্রধান কাঁচামাল ভুট্টা ও সয়াবিনের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখে। এ বিষয়ে সরকারের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের দরকার আছে।

পোলট্রি শিল্পের উদ্যোক্তারা ডিম ও মুরগির জন্য ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ মূল্য সার্বিকভাবে কার্যকর করা, খাবারের দাম কমাতে হস্তক্ষেপ, ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা দেয়া এবং অফ-সিজনে ভর্তুকি দেয়ার দাবি জানান। সেই সাথে গোশত ও ডিম সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপন, রফতানি বাজার অনুসন্ধানের মতো কিছু দাবি জানান।

গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য এ খাতের সুষ্ঠু বিকাশ জরুরি। দেশের ১৮ কোটি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার জন্যও এর বিকল্প নেই। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দীর্ঘ দিন ধরে নিম্ন এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে মাছ-গোশতসহ পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহ করা দুঃসাধ্য। দাম কিছুটা নাগালের মধ্যে থাকায় ব্রয়লার মুরগি এখনো অন্তত অনেক মধ্যবিত্তের খাবারের টেবিলে ওঠে। পোলট্রি শিল্প ধ্বংস হলে নিম্ন ও মাঝারি আয়ের মানুষের পাতে আর কখনো গোশত পড়বে না।

এ বিষয়ে অবশ্যই সরকারের দায়িত্ব ও করণীয় আছে। আমরা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কার্যকর নীতিগত ও প্রশাসনিক উদ্যোগ আশা করি।