আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গলদ পরতে পরতে। বৈশ্বিক শিক্ষার মানের তুলনায় এ দেশে প্রাথমিক থেকে উচ্চতর লেখাপড়ার মান সমসাময়িককালে তলানিতে পৌঁছেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিপর্যস্ত করে ফেলা হয়েছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা বৈশ্বিক পর্যায়ে অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।

নয়া দিগন্তের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আমাদের প্রাথমিকের শিক্ষার মান এতটাই তলানিতে যে, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিটের মাধ্যমে পরিচালিত জরিপে ঢাকা মহানগরীর তিনটি থানায় (মতিঝিল, রমনা, ধানমন্ডি) ২১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে দেখা গেছে, একটি বিদ্যালয়ও সবুজ ক্যাটাগরিতে স্থান পায়নি। এমনকি হলুদে পড়েছে মাত্র ছয়টি বিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের শিখন মান বা দক্ষতা অর্জনের বিবেচনায় শূন্য থেকে ৬০ শতাংশ হলে লাল, ৬১ থেকে ৭৯ শতাংশ হলে হলুদ এবং ৮১ থেকে ১০০ শতাংশ হলে সবুজ ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়। ঢাকার বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান এমন হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোর শিক্ষার মান সহজে অনুমেয়।

শিশু শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কী শিখছে, এসব দুর্বলতা অনেক আগেই শনাক্ত করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা করা হয়নি। সাম্প্রতিক জরিপে বেশ কিছু দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা পরিবর্তন করে ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্টের (এনএসএ) আদলে মৌলিক দক্ষতা জরিপের মাধ্যমে প্রতিটি বিদ্যালয়কে মান অনুযায়ী সবুজ, হলুদ ও লাল ক্যাটাগরিতে চিহ্নিতের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ দুর্বলতা কাটিয়ে কিভাবে প্রাথমিক শিক্ষা সবল করা যায় প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সংস্কার পরামর্শ কমিটি ১৪টি সুর্নিদিষ্ট সুপারিশ করেছে।

শিক্ষা সংস্কারে কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। কিছু সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করে এতে গতি আনতে হবে। এর মধ্যে শিক্ষক সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা জরুরি। প্রত্যেক শিশুর মানসম্মত শিক্ষায় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত অনূর্ধ্ব ১:৩০ নিশ্চিত করা দরকার। আর পিছিয়ে পড়া শিশুদের জন্য শ্রেণীর ভেতরে-বাইরে নিরাময়মূলক সহায়তা দিতে হবে। এ জন্য চাই প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক। আশার কথাÑ আইনি জটিলতা মুক্ত হয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে তৃতীয় ধাপে সুপারিশ পাওয়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের ৬ হাজার ৫৩১ জনের নিয়োগপত্র জারি, যোগদান ও পদায়নের বিষয়ে প্রশাসনিক অনুমোদন দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর আগে ওই ৬ হাজার ৫৩১ জনের প্রকাশিত ফল বাতিলসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের করা লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) মঞ্জুর করেন আপিল বিভাগ। এসব শিক্ষক নিয়োগ পেয়ে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করলে বহু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সঙ্কট থাকবে না, এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়।

আমাদের মনে রাখা আবশ্যক, প্রাথমিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য হিসেবে শিশুদের বাংলা ও গণিতের ভিত্তিমূলক দক্ষতা অর্জনে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলা শুধু একটি বিষয় নয়, এটি অন্য সব বিষয়ে প্রবেশের চাবিকাঠি। গণিতে মৌলিক দক্ষতা অর্জিত না হলে শিক্ষার্থীরা শিখনে ক্রমাগত পিছিয়ে থাকবে। তাই শিখন সময় বাড়ানো দরকার।