অভিন্ন নদীর পানি প্রাপ্তিতে ভাটির দেশ বাংলাদেশ বঞ্চিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক নদীর পানির হিস্যা নিয়ে উজানের দেশ ভারত কোনো সমঝোতা করতে রাজি নয় বাংলাদেশের সাথে। দেশটি নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী অভিন্ন নদী থেকে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে ভরা বর্ষায় আমরা বন্যায় ডুবছি; খরা মৌসুমে শুকিয়ে মরছি। একটি মাত্র নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে চুক্তি ছিল। সেই গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদও ২০২৬ সালে শেষ হবে। যথাযথ না মানলেও এ চুক্তির বলে শুকনো মৌসুমে কিছু পানি আমরা পেয়েছি। এর মধ্যে ভারত যে ইঙ্গিত দিচ্ছে; তাতে আগের মতো এ নদীর পানির হিস্যা দিয়ে চুক্তি নবায়ন করবে না দিল্লি।
গঙ্গা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৯৬ সালে। চুক্তি অনুযায়ী, বছরের সবচেয়ে কম প্রবাহের সময়কালে এপ্রিলের শেষ ১০ দিন ফারাক্কা পয়েন্টে ৫৫ হাজার কিউসেক পানির মধ্যে বাংলাদেশ পাবে ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক। ভারত পাবে ২০ হাজার ৫০০ কিউসেক। ফারাক্কা পয়েন্টে পানি যদি এর চেয়ে কমে যায় তাহলে বাংলাদেশ প্রাপ্য অংশের ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ২৭ হাজার ৬০০ কিউসেক পানি পাবে। চুক্তিটি করতে বাংলাদেশকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পানি ইস্যুটি জাতিসঙ্ঘে নিয়ে যান। পরবর্তীতে বেগম জিয়াও দু’বার এ সমস্যা বিশ্বসংস্থায় উত্থাপন করেন। সেই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় চুক্তিটি করা সম্ভব হয়েছিল।
বাংলাদেশের বিগত সরকারগুলো অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে সমঝোতার চেষ্টা করেছে। তিস্তা নিয়ে দিল্লি বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও চুক্তি করেনি। এ সময়ে উল্টো ফেনী নদীর বাংলাদেশ অংশ থেকে অতিরিক্ত পানি তুলে নেয়ার চুক্তি ঠিকই শেখ হাসিনার সাথে করে নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক নদীতে পানির অধিকার ভাটির বাংলাদেশের রয়েছে- তা ভারত স্বীকার করতে চায় না। শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর ভারত শত্রুতার নীতি আরো বাড়িয়েছে। পণ্য পরিবহনসহ কিছু দ্বিপক্ষীয় চুক্তি দেশটি ইতোমধ্যে বাতিল করছে। অব্যাহত পুশইনের অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। এদিকে গঙ্গা চুক্তির বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানাচ্ছে দিল্লি। ভারতের নিজের এখন আগের চেয়ে বেশি পানি প্রয়োজন। কৃষি-সেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় আরো পানির চাহিদা রয়েছে দেশটির। ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে তাই ভারত আরো বেশি পানি সরিয়ে নিতে চায়। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তা-ই করবে। চুক্তি হুবহু মেনে না চললেও গঙ্গায় যতটুকু পানি পাওয়া যেত, ২০২৬ সালের পর তাও পাওয়া যাবে না।
এ অবস্থায় ঢাকাকে নিজস্ব করণীয় ঠিক করতে হবে। শুধু গঙ্গা চুক্তি নয়; বরং অভিন্ন ৫৪টি নদীর প্রতিটির পানি প্রাপ্তির দাবি আমাদের তুলতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, কিছু নদী রয়েছে যাতে নেপাল ও চীন অংশীদার। নদীর পানির হিস্যায় উজানের অন্যান্য দেশকে আমাদের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। একটি আঞ্চলিক সমন্বয়ের দাবি তুলতে হবে। অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে বিশ্ব দরবারে ইস্যুটি উত্থাপন করতে হবে।