সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে অবাধে। এতে করে অনেক ব্যাংক দুস্থ হয়ে পড়ে। অন্য ব্যাংক থেকে টাকা সংগ্রহ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে জোগান দিলেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। দুর্বল দুয়েকটি ব্যাংক এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বটে, কিন্তু বেশ কয়েকটি ব্যাংকের অবস্থা শোচনীয়। আমানতকারীদের সঞ্চিত টাকা দেয়ার মতো অবস্থাও এসব ব্যাংকের নেই।

অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও নিয়ম-নীতি অনুযায়ী ব্যাংক পরিচালনার দিকে এগোচ্ছে। এজন্য প্রয়োজনীয় আইনি অবকাঠামো তৈরি করছে। ব্যাংক খাতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে আনতে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে যে আইনগত কর্তৃত্ব থাকা দরকার তা দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে।

ব্যাংক রেজুলিউশন অর্ডিন্যান্স নামে একটি আইনের খসড়া তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষা করে দুর্বল ব্যাংকের বিষয়ে যেকোনো পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন অংশীজনের মতামত গ্রহণে খসড়াটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে অংশীজনের দেয়া মতামতের ভিত্তিতে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হবে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে খসড়া আইনের বিষয়ে জানা যাচ্ছে, এ আইন পাস হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন করতে বা বন্ধ করে দিতে পারবে, দরকার মনে করলে অন্য ব্যাংকের সাথে একীভূত করতে, দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, প্রধান নির্বাহীর অপসারণ, প্রয়োজনে নতুন শেয়ার সৃষ্টি করে অন্য শেয়ারহোল্ডারদের কাছে হস্তান্তর, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সহজে হস্তান্তরযোগ্য সম্পদ বা আমানত মূলধনে রূপান্তর করতে পারবে। তবে সর্বাবস্থায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানতকারীদের আমানতের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

আমাদের বিবেচনায়, দেশে চোরতন্ত্র কায়েম করা পতিত স্বৈরাচারের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যাংক খাতের পুনরুজ্জীবনে ব্যাংক রেজুলিউশনের খসড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে যেসব ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অর্পণের কথা বলা হয়েছে সেগুলো যথার্থ। পাশাপাশি ‘প্রমোট কারেক্টিভ অ্যাকশন’ শীর্ষক যে নীতিমালা গত জানুয়ারিতে কার্যকর হয়েছে সেটিও ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে জোরালো ভূমিকা রাখবে। কারণ, নীতিমালা অনুযায়ী যেসব ব্যাংকে সুশাসনের ঘাটতি, মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ, তারল্য সঙ্কট আছে সেগুলোর ঋণ বিতরণ এবং আমানত নেয়া বন্ধ করতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই সাথে পর্ষদ বাতিল করতে এবং আর্থিক অবস্থার উন্নতি না হলে আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে।

নীতিমালার আলোকে দুর্বল ব্যাংকের বিষয়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার সরাসরি নিয়ন্ত্রণে এক বা একাধিক ব্রিজ ব্যাংক গঠন করতে পারবে। ‘ব্রিজ ব্যাংক’ হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দুর্বল ব্যাংক সবল করতে ভূমিকা রাখবে। দুর্বল ব্যাংকের কার্যক্রম ব্রিজ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। এটি ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে সংযোগ সেতুর মতো কাজ করবে।

শুধু ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সততা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে এর প্রয়োগ। সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।