নদীকে প্রাচীর দিয়ে দেশের সীমানায় বেঁধে রাখা যায় না। এর উৎস গতিপথ এবং সাগরে মিলিত হওয়া নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সীমানা দিয়ে দেশ তৈরি হলেও নদী সেটা মানে না। এদিকে দুই পাড়ের প্রাণ প্রকৃতিকে নদী গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ভূ-পৃষ্ঠের কিছু জায়গা রয়েছে বিশেষভাবে নদীর ওপর তার দুই পাড়ের মানুষের নির্ভরশীলতা বেশি। এমন একটি অঞ্চলে রয়েছে বাংলাদেশ। এখানে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে নদী। এগুলোর বড় অংশের উৎস ভারতে। উজানে ভারত একের পর এক পানির ধারা নিয়ন্ত্রণ করায় ভাটির বাংলাদেশের নদীনির্ভর জীবন যাত্রা গভীর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশটি ১৯৪০ এর দশকে পানি নিয়ন্ত্রণ শুরু করে, এ নিয়ে তাদের সাথে ভাটির দেশের আলোচনাও তখন থেকে শুরু হয়। খুব কম ক্ষেত্রে সমঝোতা করেছে ভারত। অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ইস্যুর মতো পানির হিস্যা দিতেও তারা একেবারে প্রস্তুত নয়।

উজানে ভারত পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় ভাটির বাংলাদেশের জনজীবন ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত, বিভিন্ন গবেষণায় তা উঠে আসছে। তিস্তার উজানে দেশটি ৯টি বাঁধ ও দু’টি ব্যারাজ নির্মাণ করেছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশে শুকনো মৌসুমে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত প্রানিপ্রবাহ কমেছে। শুকনো মৌসুমে পানি না পাওয়ায় ফসল ফলানো যাচ্ছে না। সেচের এলাকা কমে গেছে। কিছু এলাকায় দেখা গেছে, সেচের জন্য তিনগুণ পর্যন্ত বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় তিস্তা থেকে হারিয়ে গেছে ১০৬ প্রজাতির মাছ। ১৯৭০ সালে এতে ১৪০ প্রজাতির মাছের আনাগোনা ছিল এখন মাত্র ৩৪ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়।

ভাটিতে মরুকরণ হচ্ছে মাছ ও ফসল উৎপাদন বড়দাগে কমছে। শুধু ২০২০ সালে তিস্তার দুই পাড় থেকে ৯০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কৃষক ও মৎস্যজীবীরা জীবিকার উৎস হারানোয় জন্মভিটা ত্যাগ করছেন। সরকারি হিসেবে ভারতের সাথে অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৪ থেকে ৫৭টি। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশ দু’টির মধ্যে ১২৩টি নদী রয়েছে। প্রত্যেকটি নদী পানি আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। ন্যায্য হিস্যা পেতে অভিন্ন নদী নিয়ে আলাদা আলাদা করে ভারতের সাথে আলোচনা শুরু করা যায়নি। এক তিস্তা নিয়ে ৭০ বছরে কোনো চুক্তি করা সম্ভব হয়নি। তিস্তার মতো প্রায় সব নদীর দুই কূলের বাংলাদেশ অঞ্চলের মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে।

অভিন্ন নদী বাংলাদেশের জন্য একটি জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় সব নদীর উজানে পানি প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ভারত। এই অবস্থায় নদীমাতৃক বাংলাদেশের জীবন, প্রাণ ও প্রকৃতি সত্যিকার অর্থে হুমকির মধ্যে রয়েছে। পরিবেশবাদী আন্দোলনকারী, নদীর পাড়ের লোকালয় এবং বিশেষজ্ঞরা পানিপ্রাপ্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এদিকে বিগত সরকারগুলো ভারতের সাথে বরাবর বন্ধুত্বের সম্পর্কের দাবি করেছে। বাস্তবে তারা দেশটির সাথে থাকা আমাদের গুরুতর স্বার্থের সম্পর্কগুলো সুরাহা করতে পারেনি। নদীর পানিপ্রাপ্তি নিয়ে দ্বিপক্ষীয়ভাবে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে আর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। অথচ নদীর প্রবাহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে। সালিসির ব্যবস্থা আছে। সরকারের উচিত পানি সমস্যাটি বহুপক্ষীর ফোরামে উপস্থাপন করা।