সৈয়দ তোশারফ আলী
গেল ৯ সেপ্টেম্বর বহুল প্রচারিত একটি দৈনিক পত্রিকায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমানের একটি মতামত প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকাটি বস্তুত নতুন একটি পরিকল্পনা সামনে আনার চেষ্টা করছে। আর সেই প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছেন হোসেন জিল্লুর রহমান। বিআইডিএসের তিনি একজন শীর্ষস্থানীয় গবেষক। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন পদত্যাগ করলে ২০০৮ সালের ৯ জানুয়ারি তাকে শিক্ষা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পদে নিয়োগ করা হয়। অর্থনীতির গবেষক হিসেবে তার আগ্রহের বিষয় ছিল দারিদ্র্য সূচকের ওঠানামা পর্যবেক্ষণ ও তার কার্যকারণ বিচার-বিশ্লেষণ করা। শিক্ষা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে তিনি কতটা তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন সেটি তিনি ভালো জানেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ ও তাদের যে কজন সহযোগী নির্বাচিত রাজনৈতি সরকার ও বিরোধী দলের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, হোসেন জিল্লুর রহমান তাদের মধ্যে ছিলেন না।
এবার আমারা তার সাম্প্রতিক মতামত বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখার চেষ্টা করব। তিনি যে কথা দিয়ে তার বক্তব্য শেষ করেছেন সেখান থেকে আলোচনা শুরু করা যাক। তিনি কোনো রাখঢাক না রেখে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কাগুজে প্রতিশ্রুতির প্রতি আমাদের কোনো আকর্ষণ নেই।
কি ধরনের প্রতিশ্রুতির প্রতি তিনি ও তার সাথে সহমত পোষণকারীরা আকর্ষণ বোধ করেন সে কথা কিন্তু পরিষ্কার বলেননি। এ ছাড়া ‘আমাদের’ বলতে তিনি ঠিক কাদের বুঝিয়েছেন তা-ও অস্পষ্ট। তবে যেটি স্পষ্ট তা হচ্ছে- তিনি ও তার সাথে সহমত পোষণকারীরা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আলোচনাকে ‘ড্রয়িং রুম’ আলোচনা হিসেবে দেখছেন। সেই সাথে তার বাইরে তারা একটি সামাজিক উদ্যোগ দরকার বলে ভাবছেন। এ ভাবনার কারণ হচ্ছে- সরকার, সরকারি কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলো আশাবাদ তৈরি করতে পারছে না। তাদের ধারণা, কেবল মুখের কথায় অনিশ্চয়তা দূর হবে না। অনিশ্চয়তা দূর করতে হলে একটি বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবতা তৈরি করতে হবে। তার জন্য নিতে হবে আরেকটি নতুন উদ্যোগ। সেই উদ্যোগে রাখতে হবে তার ভাষায়- তিন ধরনের অ্যাক্টর। ১. রাজনীতিক; ২. ব্যবসায়ী; ৩. পেশাজীবী। এই পেশাজীবী ক্যাটাগরিতে সশস্ত্রবাহিনীও থাকবে। আর এ নতুন উদ্যোগের লক্ষ্য হবে :
১. অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করা এবং আর্থিক ক্ষেত্রে গড়ে ওঠা পুরনো অলিগার্কিক মডেল ভেঙে নতুন মডেল তৈরি করা।
২. শিক্ষা নিয়ে জাতীয়পর্যায়ে চিন্তাভাবনা করা এবং লাইনচ্যুত শিক্ষাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা।
৩. জীবনের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য খাতের পুনর্গঠন।
৪. অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভ‚ত কর্তৃত্ববাদী শাসন ঠেকাতে বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেয়া এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করা।
৫. আর ভ‚রাজনীতি ও ভ‚কৌশল নির্ধারণ করবে সশস্ত্রবাহিনী।
এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করার তাগিদ অনুভবের কারণ ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে উত্তরণের রূপকল্প ঘোষণা করায় জাতীয় শক্তিগুলো দিকনির্দেশনা পেয়েছে, যা ইতিবাচক। এরপর অপ্রাসঙ্গিকভাবে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি সম্পর্কে একটি নেতিবাচক তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, যার ভিত্তি হচ্ছে ২০২২ সালের সরকারি জরিপ। যেখানে এ হার দেখানো হয়েছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ওই সময়ের সরকারি জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না তুলে তার সাথে তুলনা করার সময় সরকারি জরিপের উল্লেখ না করে তিনি তার নিজের সংস্থা পিপিআরসির একটি জরিপের উল্লেখ করে বলেছেন, দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ শতাংশ। এ দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়তে পারে কিন্তু এই পিপিআরসির মতো একটি অপরিচিত জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু? এ সংক্রান্ত অন্য কোনো সংস্থার জরিপ রিপোর্ট প্রাপ্তির কি কোনো সুযোগ ছিল না? এরপর তিনি যেটি করেছেন, এ দারিদ্র্য হার বৃদ্ধির ইস্যুটি বৃহত্তর অর্থনীতির সাথে যুক্ত করে সরকার ও নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ছেড়েছেন। কারণ তারা বিগত এক বছর ব্যয় করেছেন সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে আলোচনায়।
যদিও তিনি নিজেও চান সংস্কার, গণতন্ত্রে উত্তরণ, সাংবিধানিক সংস্কার- ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হোক, তবে তার মূল লক্ষ্য হতে হবে ‘মানুষের কল্যাণ’। তবে কি, এখন যে আলোচনা হচ্ছে তার লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ নয়? তিনি কী মানুষের কল্যাণ বলতে বিশেষ কোনো শ্রেণীর কল্যাণ বুঝে থাকেন, তাও খোলাসা করেননি। করলে ভালো হতো। কারণ, মানুষের সমাজ অবিভাজ্য নয়; বরং শ্রেণী বিভক্ত। সবার জন্য কোনো ব্যবস্থা সমান কল্যাণ বহন করে না। এ জন্য বোধ হয় ইংরেজ দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম সর্বাধিক মানুষের বেশি সুখের কথা বলেছিলেন। তার চিন্তায় দারিদ্র্য ব্যাপারটি গা সওয়া সাধারণ কোনো বিষয় নয়। তিনি এমন একটি পথে হাঁটতে চান যে পথে হাঁটলে সমৃদ্ধির সিংহদ্বারে পৌঁছানো যায়। তাই তিনি রাখঢাক না করে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে দারিদ্র্য নিরসনে উল্টো পথে হাঁটার অভিযোগ এনেছেন। এ অভিযোগ নিঃসন্দেহে নির্মম!
অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতায় আনাকে অন্যতম অর্জন বলে স্বীকার করা সত্ত্বেও অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। এ কারণে তিনি স্থবিরতা নিয়ে কথা তুলেছেন। অনেকের মতো তার কাছেও বেকারত্ব এখন বড় সমস্যা এবং কর্মসংস্থানে চলছে মহাদুর্যোগ। সরকারি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার বাড়ছে। এ নিয়ে তিনি তার নিজের ভাবনা তুলে ধরার বদলে সরকার, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে ভাবতে বলেছেন। সেই সাথে ভাবতে বলেছেন গণতন্ত্রে উত্তরণে ঘোষিত রূপকল্পে দৃশ্যমান অনিশ্চয়তা মোকাবেলার উপায় উদ্ভাবনে।
তিনি সরকারের কার্যকর উপস্থিতি নয়, অনুপস্থিত সরকার সিনড্রোম দেখতে পাচ্ছেন। সেই সাথে অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা বাড়ছে, অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা হতে পারে এবং কম প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের আশঙ্কার কথাও তিনি বলেছেন। সেই সাথে আরো বলেছেন, রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো গণতান্ত্রিক উত্তরণের নিশ্চয়তা তৈরির বদলে একটি মারাত্মক সঙ্কীর্ণ স্বার্থের খেলায় বেশি মনোযোগী এবং এ কারণে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাজ পরিসমাপ্তির দিকে যাচ্ছে না।
নির্বাচন নিয়ে তার মতো আরো অনেকে সহিংসতার আশঙ্কা করছেন কিন্তু কেউ এটি পরিষ্কার করছেন না, কারা এ সহিংসতা করবে বা করতে পারে? কম প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন বলতে কী বুঝানো হচ্ছে, তাও অস্পষ্ট। রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো, যারা তার ভাষায় ‘মারাত্মক সঙ্কীর্ণ স্বার্থের খেলায়’ মত্ত তাদের পরিচয় আরো পরিষ্কার করা জরুরি ছিল।
হোসেন জিল্লুর চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করে গণতান্ত্রিক উত্তরণের বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব দিতে একে গুণগত ও মানসম্মত উত্তরণ হিসেবে দেখতে চান। রাষ্ট্রের সার্বিক শাসন ও মানুষের অধিকার ভিত্তিক অবস্থান নিশ্চিত করা তার মতে গুণগত উত্তরণ।
আমরা হোসেন জিল্লুর রহমানের নতুন সামাজিক উদ্যোগের প্রস্তাব ও উদ্বেগের জায়গাগুলো সম্পর্কে একটি ধারণা পেলাম। অর্থনীতি গবেষক হিসেবে তিনি তার উপলব্ধি যথাসাধ্য তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, এ জন্য তাকে ধন্যবাদ। কিন্তু রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় অর্থনীতির যে সমূহ সর্বনাশ করা হয়েছে, তাকে স্থিতিশীলতায় আনাই ছিল দুরূহতম কাজ। অর্থনীতি যে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েনি সেটি আমাদের সৌভাগ্য। বস্তুত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের রক্ষা করেছে। অর্থনীতির গতি মন্থর হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ কর্তৃত্ববাদী শাসনাধীনে গড়ে ওঠা অলিগার্কিকদের কারসাজি। সংগঠিত শক্তির নেতৃত্বে ছাত্র গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হলে তার ফল হতো অন্যরকম। অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত নয় এমন তরুণ-তরুণীদের পক্ষে ব্যবসায়-বাণিজ্য, কৃষি-শিল্প সম্পর্কে পলিসি গাইড করা সম্ভব নয়। ড. ইউনূস এবং কয়েকজন অভিজ্ঞ লোক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে থাকায় প্রাথমিক সঙ্কট সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছে। তাকে সহযোগিতা করলে আরো ভালো ফল পাওয়া যেত বলে আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার পুনর্গঠন সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। রাতারাতি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার অর্থ আমাদের কোষাগারে নেই। পরিকল্পনামাফিক এগোতে হবে। তবে সব কিছুর ওপর জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রশ্নটি অগ্রাধিকার দিতে হবে। যাতে দেশের প্রতি ইঞ্চি ভ‚মি সুরক্ষিত থাকে। এ ব্যাপারে আমরা বিশ্বস্ত বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার আশা রাখি।
হোসেন জিল্লুর স্থানীয় সরকার পুনর্গঠনের যে কথা বলেছেন, তার সাথে সহমত পোষণ করে বলছি- আগামীতে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। বিপুল জনগোষ্ঠীর নিত্যদিনের চাহিদা পূরণ করতে নিয়মিত ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাজনৈতিক দল বিশেষের আপত্তির কারণে দ্বিধায় ভুগলে হবে না। জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে ঠিক করতে হবে কোন পদ্ধতির সরকার বাংলাদেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, না রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার? আমাদের জাতিগত দুর্বলতা আমরা শুরু করি, শেষ করি না। এবার এ বদনাম ঘুচুক। ড. ইউনূসের উদ্যোগ শেষ হোক। তারপর প্রয়োজন হলে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের নিয়ে নতুন সামাজিক উদ্যোগ নেয়া যাবে। তবে সে ক্ষেত্রে আরো জরুরি বিষয় আলোচনায় আসবে, যা হোসেন জিল্লুরের চিন্তায় থাকতে পারে, কিন্তু আলোচনায় আসেনি।
লেখক : সাবেক নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক ও সাবেক সম্পাদক, সাপ্তাহিক রোববার