নির্বাচনের বাকি আছে মাত্র এক মাস; কিন্তু এ নিয়ে নানা উদ্বেগ-শঙ্কা এখনো কাটেনি। বিশেষ করে নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ ও নিরাপদ হবে, তা নিয়ে সব মহলেই দ্বিধা ও সংশয় কাজ করছে। বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এর অন্যতম কারণ।

দেশে এই মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলার যে অবস্থা তা পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। একের পর এক চোরাগোপ্তা হামলা, গুলি, হত্যার মতো ঘটনা জনমনে উদ্বেগ গভীর করেছে। নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে। রাজধানীতে নির্বাচনী জনসংযোগে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে খুন করা হয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে। গুলি করে হত্যা করা হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে। গাজীপুরে এনসিপির এক কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনায় পরিস্থিতি জটিলতর হয়েছে। নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। কেউ কেউ বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন।

এই পরিস্থিতি তৈরির পেছনেও কারণ আছে। প্রতিটি নির্বাচনের আগে সবচেয়ে জরুরি ভিত্তিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালানো হয়। বৈধ অস্ত্রও জমা রাখা হয় সরকারের কাছে। এবারো অভিযান চলছে; কিন্তু তা উদ্বেগ দূর করার মতো কার্যকর নয়।

চাঁদাবাজ, দুর্বৃত্তদের হাতে যেসব অস্ত্র ছিল তার বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। চব্বিশের আগস্টে লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্রের একাংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কাছে থাকা বৈধ-অবৈধ অস্ত্রও তাদের হাতেই আছে বলে ধারণা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর। এর পাশাপাশি সীমান্তের ওপার থেকে দেদার অস্ত্র আসছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা নিজেই সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। পুলিশের মহাপরিদর্শকও (আইজিপি) হত্যাকাণ্ডগুলো উদ্বেগজনক বলেছেন। নির্বাচন কমিশনও অস্ত্র উদ্ধারের ওপর জোর দিয়েছে।

এ দিকে নয়া দিগন্তের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে- নির্বাচন ঘিরে দেশী-বিদেশী অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্র তৎপর হয়ে উঠেছে। আন্ডারওয়ার্ল্ড শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবমিলিয়ে আসন্ন নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে এখনই সমন্বিত অভিযান চালানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে সতর্ক করেছেন যে, অন্যথা হলে নির্বাচন ঘিরে সন্ত্রাস, সহিংসতা বহু গুণ বাড়তে পারে। এতে শুধু নির্বাচন নয়, সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নাগরিক নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়বে।

এই মুহূর্তে সুষ্ঠু নির্বাচন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। কারণ সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকলে নির্বাচনও সুষ্ঠু হবে না। নিরাপত্তার অভাব বোধ করলে ভোটকেন্দ্রে সাধারণ ভোটারের উপস্থিতি কমবে। তাতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

নির্বাচনে সব দল ও প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ আছে। প্রশাসন বিশেষ দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে- এমন নজির এরই মধ্যে দেখা গেছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সতর্কতার বিকল্প নেই। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও নিরাপদ পরিবেশ- দুটোই নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা অসম্ভব হবে।

নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়। নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে আইন প্রয়োগে রাষ্ট্রের সক্ষমতারও পরীক্ষা হয়ে যায়। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হতে পারলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে।