প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশের মানুষকে বন্যার মুখোমুখি হতে হয়। এখন দু’টি কারণে দেশে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখা যায়। ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি উজান থেকে নেমে আসা পানিতে স্বাভাবিক বন্যা হয়। অন্যটি, প্রচুর বৃষ্টিপাতের সময় ভারত আন্তঃনদীর বাঁধ খুলে দিলে আমাদের দেশে বন্যার ভয়াবহতা বহু গুণে বেড়ে যায়। এতে করে হঠাৎ অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়। স্বাভাবিক বন্যায় কিছু উদ্যোগ নেয়া যায়; কিন্তু মানবসৃষ্ট কৃত্রিম বন্যার ক্ষতি মোকাবেলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। এবারো কিছু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। আগাম সতর্কতা অবলম্বন করা হলে আশা করা যায়, ফসল ও জানমালের ক্ষতি কমানো যাবে।

গত কয়েক দিনে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সড়ক ডুবে যাওয়ায় সুনামগঞ্জ জেলা শহরের সাথে তাহিরপুরের যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। জাফলংয়ের আশপাশের অঞ্চল তলিয়ে গেছে। স্থানীয় একটি পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দোয়ারাবাজার, ছাতক ও সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকার ঘরবাড়ি দোকানপাট কৃষিজমি ও কয়লা ডিপোতে পানি উঠেছে। এর মধ্যে ভারতের মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টিপাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত শনি ও রোববারে সীমান্তের কাছাকাছি ভারতের বিভিন্ন পয়েন্টে থেকে ৩০০-৫২৬ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সীমান্তের নদীগুলোতে গত কয়েক দিনে তাই পানি বাড়ছে। এ কারণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা আছে।

কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলেও নদীর পানি বাড়ছে। কুড়িগ্রামের কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র প্রকাশিত পূর্বাভাসে বলা হয়েছে– ২১-৩০ জুন পর্যন্ত দেশের উত্তরাঞ্চলে ও সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। ৩৫০-৪০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সীমান্তের ওপারে কোথাও বাঁধ খুলে দেয়া হলে দেশের ভেতরে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে।

গত কয়েক বছর সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে উপর্যুপরি বন্যায় ঘরবাড়ি-দোকানপাট ও ফসলের বিপুল ক্ষতি হয়েছে। তখন আগাম প্রস্তুতির ছাপ ছিল না। ফলে ক্ষতি কমানো যায়নি। এবার সুযোগ আছে সম্ভাব্য বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণের। বন্যাপ্রবণ এলাকায় আগেভাগে সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ত্রাণ কার্যক্রমের জন্যও প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।

এ দিকে প্রধান প্রধান নদীর পানি দেশের মধ্যাঞ্চলে প্রবাহিত হওয়ার সময় তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। নদীভাঙনে জনপদ ও বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ বিলীন হয়ে যায়। ফি বছর নদীভাঙনের শিকার হাজারো মানুষ। নদী শাসন ও সংরক্ষণ করে এ সমস্যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ আছে। তবে আমাদের দেশে এর কার্যকারিতা তেমন একটা দেখা যায় না। ফলে ঘরবাড়ি ফসলের ক্ষেত হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে বিপুল মানুষ শহরে ভিড় জমায়।

বৃষ্টিপাত ও পানি বৃদ্ধির খবর সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে। আসন্ন বন্যার ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও এলাকাবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে। আশা করা যায়, দুর্যোগ মোকাবেলায় এবার সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবেন।