সিসা নামক মাদকের অনুমোদনহীন বারে সয়লাব রাজধানী ঢাকা। অলিগলিতে গড়ে ওঠা এসব বারে রাতভর তরুণ-তরুণীদের আড্ডা চলে। নেশায় বুঁদ হয়ে থাকছে তারা। সাথে চলে অনৈতিক কাজ। এ থেকে জন্ম নিচ্ছে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। সম্প্রতি বনানীতে একটি সিসা বারে পরিচিতদের সাথে রাতভর আড্ডা দিয়ে বের হওয়ার পর ছুরিকাঘাতে খুন হন মহাখালীর এক যুবক। বনানীর সেই সিসা বারটি অতীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অভিযানে বন্ধ করা হলেও আবার তা ভিন্ন নামে চালু করা হয়। লক্ষণীয় গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরাসহ বেশ কিছু এলাকায় অনুমোদনহীন সিসা বার গড়ে উঠেছে।
সহযোগী একটি দৈনিকের খবর, এসব বারে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া, এমনকি চাকরিজীবী তরুণরা নিয়মিত যাতায়াত করে। বেশির ভাগ সিসা বার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে, নামমাত্র খাবারের আড়ালে বসে নেশার আসর। শুধু ফ্লেভারযুক্ত তামাক নয়, সিসার সাথে মেশানো হয় ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলের নির্যাস কিংবা লিকুইড কোকেন। অনেক সিসা বারে মাদক সেবনের পাশাপাশি তৈরি করা হয়েছে আলাদা ‘কেবিন’। বাইরে থেকে সাধারণ বসার জায়গার মতো মনে হলেও ভেতরে পর্দা টানা বা সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ থাকে, যেখানে প্রবেশাধিকার থাকে শুধু নির্দিষ্ট গ্রাহকের। প্রতিটি কেবিন ঘণ্টাভিত্তিক ভাড়া দেয়া হয়, যেখানে অতিথিদের জন্য রাখা হয় সিসা, অ্যালকোহল ও অন্যান্য মাদক, এরপর চলে অশালীন কার্যক্রম।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নিয়ম অনুযায়ী, দেশে সিসা বার পরিচালনার কোনো বৈধ অনুমতি নেই। তবু শহরের অভিজাত এলাকায় লাইটিং ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার আড়ালে চলে এসব বার। ঢাকায় অন্তত শতাধিক সিসা বার রয়েছে। মাদক বাংলাদেশের তরুণ-যুবকদের জন্য বড় এক সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সাম্প্রতিক গবেষণা মতে, দেশে প্রাক্কলিত মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৮৩ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ ৭৭ লাখ ৬০ হাজার এবং নারী দুই লাখ ৮৫ হাজার। এর বাইরে দুই লাখ ৫৫ হাজার শিশু-কিশোর মাদকে আসক্ত। দেশের মাদকাসক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষকে মাদক থেকে নিবৃত্ত রাখতে এবং নতুন করে মাদকাসক্ত হওয়া এড়াতে যে ধরনের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দরকার তা অনুপস্থিত।
আমাদের সমাজকাঠামোতে পরিবার এখনো এক শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, যেখানে সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার শিক্ষা পাওয়ার কথা; কিন্তু অনেক পরিবারে সুশিক্ষার অভাবে কিশোর-তরুণ-যুবকরা অনায়াসে বিপথে পা বাড়িয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। তাই সর্বপ্রথম পরিবার থেকে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
রাজধানীর অলিগলিতে অনুমোদনহীন সিসা বার গড়ে উঠছে; কিন্তু এর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অনতিবিলম্বে অনুমোদনহীন সিসা বারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে বন্ধ করে দেয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। মাদকমুক্ত সমাজ গঠন যেন শুধু স্লোগান-নির্ভর না হয় সেটি সবার মনে রাখতে হবে। সঙ্গত কারণে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন।