জীবাশ্ম জ্বালানি তথা তেল ও গ্যাস পুড়িয়ে যে জ্বালানি উৎপাদন করা হয় তার বিকল্প হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি। এটি পাওয়া যায় প্রাকৃতিক উপাদান অর্থাৎ- পানি, সূর্যের আলো, বাতাসের শক্তিকে বিশেষ ব্যবস্থায় জ্বালানিতে রূপান্তরের মাধ্যমে। ফলে উৎসটা একেবারেই বিনামূল্যে আল্লাহর দান হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে; কিন্তু নানা কারণে আমরা প্রাকৃতিক উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বিশ্বের সব দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছি।
২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সে লক্ষ্যে সব দেশেই জ্বালানি রূপান্তর, সংরক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিবহন, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও আবাসনে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে; কিন্তু বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে কার্যকর কিছুই করতে পারছে না।
মঙ্গলবার এ-সংক্রান্ত আলোচনার আয়োজন করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি। আলোচনার শিরোনাম ছিল কৌতূহল জাগানোর মতো- ‘পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের গণজোয়ার : এর পরে কী এবং কারা অনুসরণ করছে?’ বক্তৃতা করার জন্য পাকিস্তান থেকে দাওয়াত দিয়ে আনা হয়, সে দেশের বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ বাসিত গৌরিকে। আলোচনায় বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরাও জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পাকিস্তানের সাফল্য বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে। পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের শিক্ষা নেয়ার আছে। গত ৫৪ বছর ধরে বাংলাদেশে পাকিস্তানের প্রতি যে কাঠামোগত ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে সেই প্রেক্ষাপটে সিপিডির এ বিষয় নির্বাচন একই সাথে সাহস এবং ইতিবাচক মানসিকতার দৃষ্টান্ত।
মুহাম্মদ বাসিত গৌরি তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, পাকিস্তানে এই খাতে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। এই টাকার বেশির ভাগই ব্যাংক থেকে আসেনি, পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ মানুষ সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এই বিনিয়োগ করেছেন। এতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের। তিনি আরো বলেন, উচ্চ কর, অর্থায়নের সঙ্কট ও নীতিগত জটিলতা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের পথে বড় বাধা।
আলোচ্য খাতে বাংলাদেশের অবস্থা নাজুক। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বর্তমানে পাকিস্তানের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪১ শতাংশ আসে জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে থেকে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ জলবিদ্যুৎ, ৯ শতাংশ পারমাণবিক এবং ৭ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে সেটি ৪ থেকে ৫ শতাংশের বেশি নয়।
তবে বর্তমান সরকার এ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফরে সৌরবিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে চীনের সাথে বড় ধরনের চুক্তি সই হতে যাচ্ছে। এবারের বাজেটেও সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নানা ধরনের কর ও রাজস্ব সুবিধা দিয়েছে। বিদ্যুৎ খাত ছাড়া বিদ্যুতায়িত অন্যান্য খাত, বৈদ্যুতিক যান (ইভি) এবং ব্যাটারি-শিল্পের জন্যও প্রণোদনা রাখা হয়েছে।
তবে সবকিছুর আগে দরকার এ ক্ষেত্রে জনবিনিয়োগের উপায় খতিয়ে দেখা। পাকিস্তানে সাধারণ মানুষ কিভাবে এই খাতে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে এলো সেটি জানা থাকলে বাংলাদেশেও সে পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। এতে সরকারের ওপর চাপ কমবে।