বিগত দশকগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জোট গঠনের প্রবণতা দেখা যায়। মূলত নিজস্ব সম্পদ সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে জীবনমানের উন্নয়নে এসব জোট গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ান। উভয় জোট আঞ্চলিক জীবনমানের উন্নয়নে বড় ধরনের ভ‚মিকা রাখছে। এদিকে দক্ষিণ এশিয়া অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চল। এখানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশের বসবাস হলেও একটি কার্যকর আঞ্চলিক জোট গঠন করা সম্ভব হয়নি। দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা-সার্ক নামে একটি জোট গঠিত হলেও বড় দেশগুলোর অসহযোগিতায় সামনে অগ্রসর হতে পারেনি। ধর্ম-বর্ণের ভিত্তিতে বিভক্তিকে উসকে দিয়ে সার্ককে শুরু থেকে পেছন দিকে টানা হয়েছে। চার দশক আগে সার্ক গঠিত হলেও এর অর্জন শূন্য বলতে হবে। সম্প্রতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার আঞ্চলিক জোটটি কার্যকর করার পক্ষে জোরালো বার্তা দিয়ে যাচ্ছে।
সার্কের মূল লক্ষ্য ছিল পরস্পর এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক সামাজিক উন্নয়ন, মুক্তবাণিজ্য প্রতিষ্ঠা, আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক শান্তি স্থাপন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, আঞ্চলিক সমস্যা সমাধান ও রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রদান। টানা কয়েক দশক সার্কের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে এ অঞ্চলের নেতারা পরস্পরের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতেন। দেখা গেল, ভারত-পাকিস্তান বৈরিতায় ওই সম্মেলনও পুপোপুরি বন্ধ রয়েছে। দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসায়-বাণিজ্য বৃদ্ধির বদলে পরস্পরের মধ্যে পাল্লা দিয়ে বাধা দেয়ার মানসিকতা বেড়েছে। প্রথমে ভারত-পাকিস্তানে এই প্রবণতা দেখা যায়। দেশ দু’টির মধ্যে এ সময়ে যুদ্ধ হয়েছে কয়েক দফায়। এর প্রভাব পড়েছে অন্যান্য দেশের ওপর।
গত দেড় দশকে বাংলাদেশে চেপে বসেছিল ভারত নিয়ন্ত্রিত একটি সরকার। সেই সরকার পাকিস্তানের প্রতি ভারতের সমান্তরাল ক‚টনীতি অবলম্বন করে। ফলে পাকিস্তানের সাথে ব্যবসায়-বাণিজ্য দুই দেশের মধ্যে প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ক‚টনৈতিক সম্পর্ক পৌঁছেছিল তলানিতে। অথচ বাংলাদেশ-পাকিস্তান উভয়ের স্বার্থে দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা ছিল উভয়ের জন্য লাভজনক। অথচ আঞ্চলিক জোট কার্যকর করা দূরে থাক; ভারত তৃতীয় দেশের সাথে সম্পর্ক বিঘ্নিত করছিল এই অঞ্চলে। ভারত প্রতিবেশী একটি দেশের সাথেও মসৃণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেনি। দিল্লির তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এ অঞ্চলের দেশগুলোতে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ ব্যাপক আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের উন্নয়নকে চূড়ায় নিয়ে গেছে। দেশগুলোর গড় মাথাপিছু আয় ৬২ হাজার ডলারের বেশি। যেখানে সার্কের গড় মাথাপিছু আয় তিন হাজার ডলারের বেশি নয়। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোও নজরকাড়া উন্নয়ন করেছে। সার্কের আট সদস্য দেশ নিজেদের প্রয়োজনে সংস্থাটির আওতায় জোটবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভ‚ত হচ্ছে। এ অবস্থায় ভারত যদি এ আঞ্চলিক সহযোগিতায় সায় না দেয়; তাহলে সার্কের বাকি সাতটি দেশ পরস্পর থেকে লাভবান হতে একজোট হওয়া উচিত। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস জানিয়েছেন, সার্ক ফেরাতে কাজ করছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এ উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। সঙ্গত কারণে তার এ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।