চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ছিল একটি স্বেচ্ছাচারী নিপীড়ক ও জাতিবিনাশী অপশক্তির বিরুদ্ধে তারুণ্যের উত্থান। গণতন্ত্র ধ্বংস, দমন-পীড়ন, লুটপাট ও দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সেই ফ্যাসিবাদী অপশক্তির অপসারণ সম্ভব হয়। নজিরবিহীন সেই অভ্যুত্থানের মূল আকাক্সক্ষা ছিল দেশবাসীকে সেই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করে আবার সুস্থ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে নেয়া। স্বৈরতন্ত্রের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত গোটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তন। এ জন্য দরকার সার্বিক সংস্কার।
অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকার ঠিক সেই সংস্কারের রূপরেখা প্রণয়নে প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়েছিল। বেশ ক’টি কমিশন গঠন করে সব রাজনৈতিক দল ও জনগণের সাথে সংলাপের আয়োজন করে। জনগণের মতামত নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কারের সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা তৈরি করে। সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। দেশবাসী বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সেই সংস্কারের সুপারিশ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দেয়। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যে দল রাষ্ট্রক্ষমতায় অভিষিক্ত হবে তাদের ওপর দায়িত্ব বর্তায় গণভোটের রায় বাস্তবায়নের; কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেই গণরায় বাস্তবায়নে অনীহা দেখাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বলা হয়, কেউ যাতে নির্বাচন ভণ্ডুল করতে না পারে শুধু সেই কারণে গণভোটের প্রস্তাব মেনে নিয়েছিলেন তারা। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে দলটি যে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কমিশনের সাথে উপর্যুপরি সংলাপে অংশ নেয়, মতামত পেশ করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে আপত্তি লিপিবদ্ধ করে, এর সবকিছু কি ছিল লোকদেখানো?
আজ সরকারের চার মাসের মেয়াদে কথাগুলো সামনে আসতে শুরু করেছে। রোববার সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের গোলটেবিলের বক্তব্যে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিএনপি সরকারের চার মাসের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনায় বলা হয়, শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনে ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে, জনগণের ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়। এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। জনগণ একটি পরিবর্তিত নতুন ব্যবস্থা চেয়েছিল, যা থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংস্কারের উদ্দেশ্য হলো- পুরনো পথে আর না হাঁটা। পুরনো পথে হাঁটলে নতুন গন্তব্যে পৌঁছা সম্ভব নয়।
বলা হয়েছে, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব-পিআরের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন বা জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ-এনসিসি গঠনের মতো বিষয়ে সরকারের অবস্থান চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রতি অবজ্ঞার লক্ষণ। জুলাই অভ্যুত্থানের জন-আকাঙ্ক্ষা প্রতি ‘অবজ্ঞা প্রদর্শন’ করে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ‘গড়িমসি’ সরকারের অনেক সাফল্য ম্লান করে দিতে পারে।
লিখিত বক্তব্যে সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার বলেন, বিএনপি সরকার যদি বুঝতে পারে, ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক দলের ক্ষমতা আরোহণের সিঁড়ি ছিল না; বরং রাষ্ট্রকে নতুনভাবে গড়ার ঐতিহাসিক ডাক ছিল; তাহলে প্রথম ১২০ দিনেই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারত।
দেশবাসী এখনো আশা করেন, তাদের ভোটে নির্বাচিত সরকার জনগণের সাথে লুকোচুরির আচরণ থেকে বেরিয়ে এসে জন-আকাঙ্ক্ষা অনুকূলে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করবে। এর অন্যথা হলে সরকারের জন্য তা হিতে বিপরীত হতে পারে।