তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে কেউ এখন চান বা না চান, ডিজিটাল পরিষেবা প্রত্যেকের জীবনে প্রায় অপরিহার্য। ই-সেবা এড়িয়ে জীবন চালানো এখন অসম্ভব; বিশেষ করে বিদেশে কোনো কাজের ক্ষেত্রে। তাই বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ই-সেবা নেন। কিন্তু আমাদের সাইবার নিরাপত্তা-ব্যবস্থা কাক্সিক্ষত মানের নয়। প্রায়ই ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়ে নানা বিপত্তি ঘটছে। এ দিকে সরকারের তেমন নজর আছে বলে মনে হয় না। থাকলে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হতো না।
গণমাধ্যমের খবর, বিদেশে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সরকারি নথি সত্যায়নে ই-অ্যাপোস্টিল সেবায় আবেদন করতে গিয়ে গুরুতর ঝুঁকিতে পড়েছেন অন্তত এক হাজার ১০০ নাগরিক। সরকারি সেবার আদলে তৈরি একাধিক নকল ওয়েবসাইটে জমা পড়েছে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, বিয়ের সনদ, শিক্ষা সনদ, ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যবসায়িক চুক্তিপত্রসহ অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য। এসব তথ্য ইন্টারনেটে উন্মুক্ত অবস্থায় দেখা গেছে, যা ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সরকারি ই-সেবার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এর আগে ‘সুরক্ষা’ প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত কোটি কোটি নাগরিকের তথ্য ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছিল, যা পরে বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন আকারেও দেখা যায়।
বাংলাদেশের কোনো সরকারি নথি বিদেশে আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য করতে হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সত্যায়ন করতে হয়। এ প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের আওতাধীন ‘এসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই)’ কর্মসূচির মাইগভ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অনলাইনে ই-অ্যাপোস্টিল সেবা চালু করা হয়। বৈধ ই-অ্যাপোস্টিল সনদে একটি কিউআর কোড থাকে, যা স্ক্যান করলে সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা যাচাই করা যায়। এটুআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মাসে প্রায় ১৭ লাখ আবেদন এ সেবার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভুয়া সনদে ব্যবহৃত কিউআর কোড স্ক্যান করলে যে ওয়েব ঠিকানায় তথ্য দেখা যায়, সেখানে ধারাবাহিক নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে একটি নম্বর পরিবর্তন করলে অন্য ব্যক্তির সম্পূর্ণ নথিতে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে। কোনো লগইন, পরিচয় যাচাই বা অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর ছাড়াই সংবেদনশীল ডেটা উন্মুক্ত থাকায় তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকি বহু গুণে বেড়েছে। পাসপোর্ট বা বিয়ের সনদের মতো নথি ফাঁস হলে পরিচয় চুরি, জালিয়াতি ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে সামাজিক ও ব্যক্তিগত ক্ষতির আশঙ্কা আরো বেশি।
নাগরিক নিজে আবেদন করুন বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে, সরকারি সেবার নামে নকল প্ল্যাটফর্মে এত বিপুল ব্যক্তিগত তথ্য জমা পড়া রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। ই-অ্যাপোস্টিল ঘিরে এই তথ্য ফাঁস শুধু কয়েকজন নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়; বরং রাষ্ট্রের ডিজিটাল সেবাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। সঙ্গত কারণে এ কথা বলা যায়, এভাবে বারবার ব্যক্তিগত তথ্য অরক্ষিত থাকায় নাগরিকদের মধ্যে ডিজিটাল সেবার প্রতি অনাস্থা বাড়বে, এটিই বাস্তবতা। তাই আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাকাঠামো নিশ্চিত করে সরকারি তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেয়ার বিকল্প নেই।