১২ দিন ধরে বিশ্বকাঁপানো ইরান-ইসরাইল সঙ্ঘাতের আপাত অবসান হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা ইরান বা ইসরাইল- কোনো দেশই দেয়নি। ট্রাম্পের ঘোষণার পরও দুই দেশই পরস্পরের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ ক্ষেত্রেও প্রথম হামলাটি চালিয়েছে ইসরাইল। ফলে এক ধরনের ধোঁয়াশা থেকেই গেছে। এ নিয়ে ট্রাম্প ইরাইলের বিরুদ্ধে চরম বিরক্তি প্রকাশ করেন। এমনকি ইসরাইলের শাস্তি হওয়া উচিত- এমনও মন্তব্য করেন।

যুদ্ধবিরতি যদি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়ও তবু সেটি ইরানের জন্য কোনো স্বস্তি বয়ে আনবে না। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ইরানকে পরমাণু সক্ষমতা অর্জন করতে দেয়া হবে না। তাদেরকে আলোচনায় আসতে হবে। আর এটি স্পষ্ট যে, আলোচনায় বসার অর্থ হলো- যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও পাশ্চাত্যের চাপের মুখে নতি স্বীকার করা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা জাতির উদ্দেশে তার সর্বশেষ ভাষণে এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, ইরান আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচবে এবং কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।

একটি বিষয় লক্ষণীয়, ইরান শক্তিপ্রয়োগে অক্ষম হলে এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসত না। ইরানের তিনটি পরমাণু স্থাপনায় মার্কিন বিমান হামলার পর ইরান যদি পাল্টা আঘাত না করে নিশ্চুপ হয়ে যেত; তাহলে পরিস্থিতি তার জন্য মারাত্মক হতো। কাতারে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ইরানি হামলার পরই ট্রাম্প আকস্মিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। ইসরাইলের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর প্রমাণ করে ইরান সে দেশের লক্ষ্যস্থলে যেভাবে আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে সেটিও ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয়। সুতরাং শক্তির বিকল্প নেই। শত্রুকে সংযত রাখার জন্য শক্তির ভূমিকাই মুখ্য। ইরান সেই শক্তি অর্জনে পিছিয়ে যাবে না- এটি নিশ্চিত।

গত ১২ দিনের সঙ্ঘাতে একটি বিষয় অনেকের নজরে এসেছে। সেটি হলো- ইরান কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করেনি। কখনো প্রথমে আক্রমণ করেনি। কখনোই বেসামরিক লক্ষ্যস্থলে হামলা চালায়নি। ইচ্ছা করলেই তারা কাতারের মার্কিন ঘাঁটিতে আকস্মিক হামলা চালিয়ে শত শত মার্কিন সেনাকে পরলোকে পাঠিয়ে দিতে পারত। তারা সেটি করেনি। আগে থেকে জানিয়েই হামলা করেছে। যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র লোকজন সরিয়ে নেয়ার সময় পেয়েছে।

এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল আগাগোড়াই ছলচাতুরী ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। ট্রাম্প দুই সপ্তাহের জন্য কূটনীতির সুযোগ রাখার কথা বলেছিলেন। কিন্তু দু’দিনের মাথায় কোনো ঘোষণা ছাড়া ইরানের ওপর হামলা করে। এই হামলার অনুমোদন দেন ট্রাম্প স্বয়ং। ইসরাইল তার আগে সব ধরনের আইন-কানুন লঙ্ঘন করে ইরানে হামলা করে তাদের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীদের হত্যা করে।

এমন একটি নীতি-নৈতিকতাহীন, মিথ্যাশ্রয়ী শক্তির বিরুদ্ধে ইরান ন্যায্যতার নীতির ওপর অটুট থেকেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এটি হলো ইসলামী রাষ্ট্রের আদর্শিক অবস্থান। এটি বিশ্বাসের শক্তি। এই সঙ্ঘাতে ইরান যেটুকু সম্মানজনক অবস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছে তা তার বিশ্বাসের শক্তির বলেই সম্ভব হয়েছে।

ইরানের পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যে অবস্থান নিয়েছে তারও ন্যূনতম যুক্তিগত ভিত্তি নেই। যেখানে একপক্ষের অনেকগুলো দেশ পরমাণু শক্তিধর শুধু নয়, অসংখ্য পরমাণু বোমার অধিকারী, সেখানে ইরানকে শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্যও পরমাণু সক্ষমতা অর্জন করতে দেয়া হবে না- এমন একগুঁয়ে চাপ শুধু অযৌক্তিক নয়, এটি চরম অন্যায় ও অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বের প্রতিটি দেশের মতো ইরানেরও অধিকার আছে নিজের যেকোনো সিদ্ধান্ত নিজেই নেয়ার।