কালোটাকা সাদা করার সুযোগ আর থাকছে না। অন্যায়, অবৈধ ও বৈষম্যমূলক ওই সুযোগ রহিত করার পর গত রোববার উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে গত ১৫ বছরের আওয়ামী চোরতন্ত্রের আদলে অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট কেনা এবং ভবন নির্মাণে অপ্রদর্শিত অর্থাৎ কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়। লুটেরা সরকারের উৎখাতের পর অর্থনীতিসহ দেশের প্রতিটি খাতে সুস্থ-স্বাভাবিক ও সুচিন্তানির্ভর ধারা ফিরে আসবে বলে জনগণ আশাবাদী হয়েছিল। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে সুশাসন ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা হবে- এটিই ছিল প্রত্যাশা। কিন্তু গত বাজেট-প্রস্তাবনায় কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রাখায় জনআকাক্সক্ষা আহত হয়। কারণ এর মধ্য দিয়ে সরকারের সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের পথ ধরেই সংঘটিত হয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। সমাজে বিদ্যমান সব বৈষম্য অবসানের আকাক্সক্ষা জোরালো হয়ে ওঠে। কালোটাকা সাদা করার সুযোগ নিঃসন্দেহে বৈষম্যমূলক। সরকার নির্ধারিত হারে নিয়মিত করদাতা বেশি পরিমাণে কর দেন। কিন্তু যারা লুটপাটের মাধ্যমে বা অন্য কোনো অবৈধ উপায়ে অর্থ আয় করে তারা অনেক কম পরিমাণে কর দিয়েই অবৈধ অর্থ বৈধ করার সুযোগ পান। এখানেই ঘটে সবচেয়ে বড় বৈষম্য। তা ছাড়া সুস্থ ও স্বাভাবিক চিন্তার যেকোনো মানুষের কাছেই এ ধরনের সুযোগ রীতিমতো অশোভন ও অরুচিকর। আওয়ামী লীগ সরকার ও তার সহযোগী গোষ্ঠী রাষ্ট্রপরিচালনা বা সুস্থ রাজনীতির জন্য নয়; বরং নিছক লুটপাট করার জন্যই সর্বশক্তিতে দেশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালের কর্মকাণ্ডই এর প্রমাণ।

স্বৈরতন্ত্র ও চোরতন্ত্রের অবসানের পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়। নতুন চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান দায়িত্ব নেয়ার পর বলেছিলেন, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়, এটি অত্যন্ত অশোভন। এর মাধ্যমে দুর্নীতি মেনে নেয়ার পাশাপাশি সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করা হয়। তিনি বলেন, ‘একজন সৎ করদাতা দীর্ঘদিন ধরে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হারে নিয়মিত কর দিয়ে আসছেন। আরেক জন কর না দিয়ে অবৈধ পন্থায় উপার্জন করে টাকাটা নিজের কাছে রেখে দিলেন। পরে কম হারে কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ নেন। এটি ঠিক নয়।

এনবিআর চেয়ারম্যান গত ১৫ বছরে আর্থিক খাতে লুটপাট ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও ঘোষণা দেন ওই সময়। যদিও খুব একটি কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার উদাহরণ দেখা যাচ্ছে না।

অন্তর্বর্তী সরকার কেন লুটেরাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি বা পারছে না সেটি বোধগম্য। আগেভাগে নির্বাচন দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিদায় করে দেয়ার যে রাজনীতি গত কয়েক মাসে দেশে উত্তাপ ছড়িয়েছিল এই অপারগতার পেছনে সেটিই মূল কারণ।

নতুন বাজেটে সাড়ে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ঠিক করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। আশা করতেই পারি, অর্থনীতিতে সুবাতাস ফিরে আসবে এবং লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জিত হবে।