স্বৈরাচারের ১৬ বছরে রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো একটি ক্ষেত্রেও শৃঙ্খলা ছিল না। জনপ্রশাসন ছিল এর কেন্দ্রে। জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা গুঁড়িয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ প্রথম ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরি করেছিল। ১৯৯৬ সালে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সচিবদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগের তথাকথিত জনতার মঞ্চে যোগ দেন। এতে শুধু জনপ্রশাসনের নয়, পুরো দেশের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। এমন হটকারী ঘটনার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক পরিণতি সবার জানা।
গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পতনের পর প্রশাসনের আওয়ামীপন্থী ও তাদের দোসর আমলাদের নিষ্ক্রিয় করা যায়নি। শৃঙ্খলাও ফিরে আসেনি; বরং আরো অবনতি ঘটেছে। সচিবালয়ে রহস্যজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের প্রত্যাহার করে নতুন ডিসি নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনে রীতিমতো কেলেঙ্কারি হয়েছে। এমনকি আমলাদের বিদ্রোহের আলামতও ধরা পড়েছে। এসব প্রশাসন এলোমেলো অবস্থার স্পষ্ট আলামত।
পত্রিকান্তরের খবরে আমলাদের নিয়োগ, পদোন্নতি নিয়ে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে তা অনাকাঙ্ক্ষিত।
খবরে বলা হয়, প্রশাসন নিয়ন্ত্রণকারী কর্তাব্যক্তিদের অদক্ষতা ও দলীয় আনুগত্যে জনপ্রশাসনে পদ-পদায়ন নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা চলছে। অন্তত পাঁচটি মন্ত্রণালয় মাসের পর মাস চলছে সচিব ছাড়া। সচিব না থাকায় ওই মন্ত্রণালয় ও এর অধীন সংস্থার প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আবার পদোন্নতি পেয়েও দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তারা পদায়ন পাচ্ছেন না, এমন ঘটনাও ঘটছে। স্পষ্টত, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরেনি। অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগ এন্তার। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতরের সচিব নিয়োগ নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থিত কর্মকর্তাদের টানাপড়েন চলছে। এমনকি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে দলীয় নেতাদের সচিবালয়ে খবরদারির মতো ঘটনার কথাও শোনা যায়। ডিসি নিয়োগে ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসন ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে সংশ্লিষ্ট সচিবের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্টরা এ অবস্থার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও উদাসীনতাকে দায়ী করছেন। অনেকের মতে, এটি সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রমাণ।
অন্তর্বর্তী সরকার এক দিকে আগুন সন্ত্রাস সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, অন্য দিকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কাজ করছে। এ সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু পতিত শাসক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত নাশকতার অবসান ঘটবে কি না সন্দেহ। এ বিষয়ে সরকারের কার্যক্রম এখনো তেমন কার্যকর নয়। অস্থিরতা চলতে থাকলে নির্বাচন অনুষ্ঠান কতটা সম্ভব তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। তার ওপর বর্তমান বিশৃঙ্খল প্রশাসন দিয়ে নির্বাচন সামাল দেয়া কতটা সম্ভব তাতেও সন্দেহ রয়েছে।
এটি নিশ্চিত, স্বৈরাচারের দোসরদের সব ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় করা ছাড়া রাষ্ট্র সুষ্ঠুভাবে চালানো সম্ভব নয়। স্বৈরাচারের বিচার এগিয়ে নিতে হবে অব্যাহতভাবে। গণ-অভ্যুত্থান ও সরকারের বৈধতা সম্পর্কিত জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি কতটা মজবুত হচ্ছে তাও সমাজের স্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের পরিবেশের ওপর এর প্রভাব পড়বে। তবে সবকিছুর আগে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবার আগে প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানো জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের শৃঙ্খলা ছাড়া কোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়।