চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর নতুন বাংলাদেশের পথচলা শুরু। গত বছরের ৫ আগস্ট দিল্লির তাঁবেদার স্বৈরাচারী হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। তখন থেকে ভারতে বসে বাংলাদেশবিরোধী অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনার পতনের তিন দিন পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ৮ আগস্ট একটি অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ফ্যাসিবাদের দোসররা দেশের ভেতরে ঘাপটি মেরে থেকে সময়-সুযোগ বুঝে বর্তমান সরকারকে বেকায়দা ফেলতে নানা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার ভার নেয়ার পর সংখ্যালঘুদের প্রতি কথিত হামলা-নির্যাতন বন্ধের দাবিতে রাজপথ উত্তপ্ত করার অপপ্রয়াস, আনসারদের দাবি-দাওয়ার নামে সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচির কথা। এসব অপকর্মের সাথে প্রতিবেশী দেশের যে যোগসাজশ আছে তাতে সন্দেহ নেই। কারণ, তাদের তাঁবেদার হাসিনা সরকারের উৎখাত মেনে নিতে পারেনি ভারত। এখনো ভারতের বাংলাদেশবিরোধী মনোভাবে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বরং বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের যেকোনো সময়ের চেয়ে তিক্ত ও শীতল।
জুলাই অভ্যুত্থান সফল পরিণতি পেয়েছে বহু প্রাণের বিনিময়ে। এই রক্তদানের বিনিময়ে প্রত্যাশা বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তর করা। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনপ্রত্যাশা পাহাড়সম। সঙ্গত কারণে জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে ড. ইউনূসের সরকার রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তনে হাত দিয়েছে। দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় জঞ্জাল অপসারণ করে মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে রাষ্ট্র সংস্কারে হাত দিয়েছে বর্তমান সরকার, যা জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মতান্তরের কারণে সংস্কারের উদ্যোগ হোঁচট খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তির যেখানে ইস্পাতকঠিন ঐক্য জরুরি, সেখানে দেশবাসীর কাছে এটিই স্পষ্ট হয়েছে যে, ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে যে সুদৃঢ় ঐক্য গড়ে উঠেছিল তা এখন আর নেই। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান যাতে বিফলে না যায়, সেজন্য শুরুতেই প্রয়োজন ছিল জুলাই ঘোষণাপত্র ঘোষণা করা। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের অংশীজনদের কারো কারো অনীহায় সম্ভব হয়নি। তবে জুলাই আন্দোলনের মূল শক্তি ছাত্র-জনতা দেরিতে হলেও জুলাই ঘোষণাপত্রের দাবিতে সোচ্চার। তাদের দাবি আমলে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার শিগগিরই ওই ঘোষণাপত্র ঘোষণা করবে এটাই প্রত্যাশিত।
নয়া দিগন্তের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এ ঘোষণাপত্রে ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধে সংবিধান পরিবর্তনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতে পারে। সরকার ও কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের উচ্চপর্যায়ে পরিবর্তনও আসতে পারে।
জুলাই ঘোষণাপত্র অত্যন্ত জরুরি। আমাদের মনে আছে, স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান সার্থক করতে রাজনৈতিক দলগুলো তিন জোটের রূপরেখা প্রণয়ন করেছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচিত সরকারগুলো গোষ্ঠীস্বার্থে তা বেমালুম ভুলে যায়। ফলে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান জনতার কাছে থেকে বেহাত হয়ে যায়। সেই আশঙ্কা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও যে সত্য হবে না তার নিশ্চয়তা কী! তাই জনপ্রত্যাশার বাস্তব রূপ অন্তর্বর্তী সরকার দেরিতে হলেও জন-অভিপ্রায় আমলে নিয়ে জুলাই ঘোষণাপত্র অবিলম্বে ঘোষণা করবে, যার আলোকে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মিত হবে।