দেশের বস্ত্রশিল্প মালিকরা জানান, ভারতের সাথে অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে সাম্প্রতিক সময়ে ৫০টি বস্ত্রকল বন্ধ হয়েছে। দুই লাখের বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে। আরো অনেক বস্ত্রকল বন্ধ হওয়ার পথে। বন্ধ কারখানাগুলোতে ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ ছিল বলে জানান তারা। এ অবস্থা চলতে থাকলে গোটা পোশাক খাতই নাজুক অবস্থায় পড়বে।
বস্ত্রকলের মালিকরা জানিয়েছেন, ভারত কম দামে বাংলাদেশে সুতা ডাম্পিং করছে। গত অর্থবছরে ভারতীয় সুতা আমদানি বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ। বাজার দরের চেয়ে ৩০-৩৫ টাকা কম দামে ভারতীয় সুতা পাওয়ায় দেশী বস্ত্র কারখানাগুলো ভারতীয় সুতা কিনছে। অন্য দিকে, দেশী কারখানার অন্তত ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত রয়ে গেছে। ভারতীয় প্রস্তুতকারকরা সরকারি প্রণোদনাসহ নানা ধরনের সুবিধা পাওয়ায় তাদের পক্ষে কম দামে সুতার বিপণন সম্ভব। বাংলাদেশে অব্যাহত জ্বালানি সরবরাহের সুবিধাও নেই। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম সম্প্রতি কমলেও দেশে কমানো হচ্ছে না।
মালিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, বস্ত্র খাতের সমস্যাগুলোর অন্যতম হলো- নগদ প্রণোদনার অস্বাভাবিক হ্র্রাস, গ্যাসের মূল্য বাড়ানো, টাকার অবমূল্যায়ন, ব্যাংক সুদের হার বাড়ানো, ইডিএফ ঋণের সুবিধা কমানো, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সঙ্কট। এসব কারণের অনেকগুলোই সার্বিকভাবে দেশের শিল্প খাতের সঙ্কট। বিষয়টি সেভাবেই দেখতে হবে।
বস্ত্র খাতের মূল সমস্যা আমাদের বিবেচনায় ভারতের একচেটিয়া বাজার দখল নীতি। তার চেয়েও বড় বিষয়, বাংলাদেশের শিল্পকাঠামো গুঁড়িয়ে দেয়ার নীতি। গত ১৫ বছর একটি অনুগত সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে তারা এ দেশের শিল্প খাতকে সর্বতোভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল রাখার বন্দোবস্ত করেছে। নানাভাবে এ দেশের শিল্পের বিকাশ ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের শিল্প মালিকদের আছে। বিটিএমএ সভাপতি নিজেই জানিয়েছেন, কিভাবে ভারত অতীতে কোনো কারণ ছাড়াই বাংলাদেশে তুলা ও সুতা রফতানি বন্ধ করে দেয়। তখন অন্য দেশ থেকে তুলা সংগ্রহে প্রায় তিন মাস সময় লাগে, যা ব্যবসায়িক শৃঙ্খলা নষ্ট করে।
এই বৈরী প্রতিবেশীকে সামলেই আমাদের শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে। এই সত্য কেবল সরকারকে নয়, শিল্প মালিকদেরও বুঝতে হবে।
বস্ত্রকল মালিকদের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আগেও বলা হয়েছে, এখনো বলা হয়েছে। সেটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কালক্ষেপণ প্রসঙ্গে। বলা হয়েছে- ভারত একটি নীতি সিদ্ধান্ত জারি করে মাত্র তিন ঘণ্টায়। কিন্তু বাংলাদেশে বছর পার হয়ে গেলেও সিদ্ধান্ত হয় না। এটি সম্ভবত সংশ্লিষ্টদের মানসিক প্রতিবন্ধকতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কর্মকর্তাদের অদক্ষতাজনিত। এ কারণেই আমরা শুধু শিল্প নয়, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি খাতেই পিছিয়ে পড়েছি। এই জড়তা থেকে আমাদের সরকারের বেরিয়ে আসা জরুরি।
শিল্প মালিকরা স্পিনিং খাত রক্ষায় বিভিন্ন ধরনের সুতার প্রচ্ছন্ন ও সরাসরি রফতানিতে ১০ শতাংশ নগদসহায়তা, রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার বাড়ানো, তহবিল থেকে দেয়া ঋণের ওপর সুদহার কমানো, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো ও ঋণ পরিশোধে রেয়াতকাল বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
সরকারকে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের শিল্প অন্য সব দেশের সাথে সমানতালে পাল্লা দিয়ে বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে পারে।