প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মালয়েশিয়া সফর গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার দিক থেকে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে দু’টি দেশের সাথে বাংলাদেশের মিল আছে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। এর মধ্যে মালয়েশিয়া হলো সেই দেশ যেটি গত জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সবার আগে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম সে সময় ঝটিকা সফরে ঢাকায় এসে সদ্য গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেন। সে সময় তিনি তার দেশে আরো বেশি বাংলাদেশী শ্রমিক নেয়া এবং তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়ার অঙ্গীকার করেন। সেই অঙ্গীকার তিনি পূরণ করেছেন।
বর্তমানে মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর অঞ্চলিক জোট আসিয়ানের চেয়ারম্যান। গত এক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি পাল্টেছে। এ কারণে দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের সংজ্ঞা নতুন অবয়ব পাচ্ছে। বিষয়টি বৃহত্তর স্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট। এসব কারণে বাংলাদেশ আসিয়ানের সাথে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী। এ জোটের সাথে বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরালো হলে তা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে। ড. ইউনূসের মালয়েশিয়া সফর উল্লিখিত সব দিক থেকেই তাৎপর্যময়।
সফরের দ্বিতীয় দিনে গত মঙ্গলবার ড. ইউনূস মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে একান্ত বৈঠক করেন। তারা দুই দেশের সম্পর্ক আরো গভীর ও কৌশলগত ভবিষ্যৎমুখী অংশীদারিত্বে রূপান্তরের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম অধ্যাপক ইউনূসকে ‘মালয়েশিয়ার বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ, শিক্ষা ও রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
উভয় নেতা আসিয়ানের সাথে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা গভীর করার বিষয়ে আলোচনা করেন। এর মধ্যে রয়েছে সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার মর্যাদা পাওয়ার বিষয়টি। ড. ইউনূস আসিয়ানের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার সমর্থন কামনা করেন। এ ছাড়াও বাংলাদেশ আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে (আরসিইপি) যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করে। এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে পাঁচটি সমঝোতাস্মারক (এমওইউ) এবং তিনটি নোট-বিনিময় চুক্তি হয়েছে।
সফরকালে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি ও জ্বালানি সহযোগিতা, সমুদ্র অর্থনীতি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ বিস্তৃত পরিসরের দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে আলোচনা হয়। এসব বিষয়ের কার্যকর ও বাস্তব রূপায়ণ সম্ভব হলে তবেই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে উপকৃত হবে।
দুই পক্ষই বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়, যাতে খরচ কমে এবং শ্রমিকদের কল্যাণ সুরক্ষিত হয়। মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘গ্র্যাজুয়েট পাস’ ভিসা চালুর অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ।
রোহিঙ্গা সঙ্কট প্রশ্নে আগামী মাসে নিউ ইয়র্কে আন্তর্জাতিক রোহিঙ্গা সম্মেলন ডেকেছে জাতিসঙ্ঘ। অধ্যাপক ইউনূস মালয়েশিয়াকে এ সম্মেলনে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানান।
এ সফরে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সার্বিক ইস্যুই পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে এসেছে। ইস্যুগুলোর কাক্সিক্ষত পরিচর্যা হলে আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে যেমন বাংলাদেশের অবস্থান মজবুত হবে, তেমনি ফ্যাসিস্ট শক্তির হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।