দেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে শিল্প খাতে স্বস্তির হাওয়া বইছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের ওপর যে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল তা কমিয়ে ২০ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে সরকারের এটি কূটনৈতিক বড় সাফল্য। এর ফলে শিল্প খাতে স্বস্তি ফিরেছে। বিশেষ করে গত মাস চারেক ধরে তৈরী পোশাক খাতে সম্ভাব্য মহাবিপর্যয়ে শঙ্কা ও যে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, তা কেটে গেছে। এ মুহূর্তে আমাদের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার ওপরও শুল্কের হার বাংলাদেশের সমান। ফলে এসব দেশের সাথে প্রতিযোগিতা সমানে সমানে চলবে। তবে ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক বসেছে। এতে বাংলাদেশ কিছুটা সুবিধা পাবে। চীনের ওপর শুল্কহার এখনো চূড়ান্ত নয়। এটি ভারতের চেয়ে কম হবে বলে মনে করেন না বিশেষজ্ঞরা। ফলে বাংলাদেশ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।

শুল্কহার ২০ শতাংশে নেমে আসায় এর মধ্যে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে স্থগিত থাকা অর্ডারগুলো ফিরে আসছে। এ সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পোশাক খাত সংশ্লিষ্টদের এবং সরকারের তরফে কিছু করণীয় আছে। পোশাক শিল্পের উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো, মার্কিন ক্রেতাদের সাথে সরাসরি সম্পর্ক জোরদার করা এবং বহুমুখী বাজারে প্রবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। আর সরকারকে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংগঠনও বলছে, শুল্ক হ্রাস স্বস্তিদায়ক হলেও একক বাজারের ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এটি চাহিদার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশী পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনা যায় কি না তা নিয়ে উদ্যোক্তাদের ভাবতে হবে। নতুন বাজার অনুসন্ধানের দিকেও নজর দিতে হবে। বিকল্প বাজার, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা ও নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে বাংলাদেশের জন্য টেকসই পথ। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়ানো একটি বিকল্প হতে পারে। পোশাক শিল্পের নানা ধরনের উপকরণের সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে। তাহলে শুল্ক কমার ফলে সৃষ্ট সুযোগগুলো বাস্তবে কাজে লাগানো যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কমার পাশাপাশি অর্থনীতিতে আরেকটি সুখবর উল্লেখযোগ্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। গত জুলাইতে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৪৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে এসেছিল ১৯১ কোটি ডলার। এ হিসেবে এক মাসে দেশে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ৫৭ কোটি ডলার। হুন্ডির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে।

সম্ভাব্য ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক এড়াতে পারা শুধু যে আমাদের পোশাক খাত ও এর ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ মানুষের জন্য বিপর্যয় রুখে দেয়া সম্ভব হয়েছে তাই নয়, এর ফলে আমাদের গোটা অর্থনীতি আপাতত রক্ষা পেয়েছে। কারণ বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা বাজার যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠানো বন্ধ হলে গোটা অর্থনীতিতে নিশ্চিত ধস নামত।